দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি পেতে যাচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে। খসড়া কমিটি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এখন তা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটির খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন মিললেই যে কোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
এর আগে সোমবার (৩ আগস্ট) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করে ছাত্রদল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, শহীদ মিনারের এই কর্মসূচির পরই নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন কমিটি গঠনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্লিন ইমেজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষার্থী রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করা হবে। এদিকে শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা শেষ মুহূর্তের সাংগঠনিক তৎপরতা ও লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
সবশেষ ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাসির উদ্দীন নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ৩৯ জন সহ-সভাপতি ও ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বর্তমান কমিটির মেয়াদ চলতি বছরের ১ মার্চ শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। গত কয়েক মাসে সম্ভাব্য নেতাদের বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে পরামর্শ করা হয়েছে।
ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, নতুন কমিটিতে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত এবং ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের মতে, নেতৃত্ব নির্বাচনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবেন।
সভাপতির দৌড়ে যাদের নাম আলোচনায়:
ছাত্রদলের নতুন সভাপতি হিসেবে কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন, শ্যামল মালুম, আমান উল্লাহ আমান, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, আবু জাফর, খোরশেদ আলম সোহেল, কাজী জিয়াউদ্দীন বাসেত, তৌহিদুর রহমান আউয়াল, মোস্তাফিজুর রহমান। এদের মধ্যে একজনকে নতুন কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হবে বলে এনপিবিকে একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম। এর আগের কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
আলোচনায় রয়েছেন সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী। খোরশেদ আলম সোহেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৭টি মামলা রয়েছে। এছাড়া অতীতে আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে অন্তত চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে।
নতুন কমিটির সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ সভাপতি এইচ এম আবু জাফর। তিনি ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এর আগে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও এস এম হল ছাত্রদলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন এই নেতা। তাছাড়া আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে গুম, রিমান্ড ও জেল ঝুলুমের শিকার হয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি মো. মনজুরুল আলম রিয়াদ। এছাড়া কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অমর একুশে হল ছাত্রদলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী মনজুরুল আলম রিয়াদ। তার বিরুদ্ধে দুইটি মামলা রয়েছে।
এছাড়াও সভাপতি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আমানউল্লাহ আমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯-১০ সেশনের এই শিক্ষার্থী এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।
সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল এর আগে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১ নম্বর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-স্বাস্থ্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে এবং তিনি একবার গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে এফসিপিএস অধ্যয়নরত। তিনি ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী। তার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা রয়েছে।
২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি পদপ্রার্থী ছিলেন। স্বৈরাচারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন, কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতের বিরুদ্ধে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে ৯টি মামলা রয়েছে। তিনি রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং দুটি মামলায় সাজাভোগ করেছেন। কয়েকটি মামলা এখনও বিচারাধীন। ২০১৫ সালে অবরোধ চলাকালে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পুলিশ তাকে ফেলে দিলে প্রায় ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৯টি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯-১০ সেশনের শিক্ষার্থী।
সাধারণ সম্পাদক পদেও একাধিক প্রার্থী
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কয়েকজন নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন, সংগঠনটির বর্তমান যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম তারিক, রাজু আহামেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সিনিয়র সহ সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন শাওন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম। এনপিবি নিউজ বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছে এদের মধ্যে একজন নতুন কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পাচ্ছেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলাম তারিক। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রদলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষা বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন তারিকুল।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস। এর আগের কমিটিতে ১নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষা বর্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ রাজু আহামেদ সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদস্য ছিলেন। এছাড়া সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী। তার বিরুদ্ধে ৩টি মামলা রয়েছে।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামের নামও আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশী রাজু আহমেদ এনপিবি নিউজকে বলেন, ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বের জন্য সারাদেশের নেতাকর্মীরা অপেক্ষা করছে। আমরা আশা করছি, আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অচিরেই আমাদের নতুন কমিটি উপহার দেবেন। বিগত সময়ে যারা আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে ছিল তাদেরকে নতুন কমিটিতে প্রাধান্য দেয়া হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল এনপিবি নিউজকে বলেন, কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, সংগঠনের ভাবমূর্তি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় যাদের যোগ্য মনে করা হবে, তাদেরই নেতৃত্বে আনা হবে। ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে, তবে কোনো ধরনের বিভেদ বা প্রতিহিংসা নেই। সবাই সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।