প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে 'লুটপাট ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টিকারী' আখ্যা দিয়ে তা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভর অর্থসংস্থান, অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং করের বাড়তি চাপের কারণে বাজেটটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। একই সঙ্গে এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেটে জনগণের প্রত্যাশিত জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত ও বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক রূপরেখার প্রতিফলন নেই। জীবনমান উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও এতে দেখা যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, 'কর প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতির ঝুঁকি থেকেই যাবে। তার দাবি, 'জুলাই সনদ'-ভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, পিএসসি, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।'
তিনি বলেন, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বজায় থাকায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট বাস্তবায়িত হলে তা জনগণের পরিবর্তে সীমিত গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বাজেটের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে বিশাল ঘাটতির কথা উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের বিপরীতে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অবাস্তব। দক্ষ কর কাঠামো ও দুর্নীতিমুক্ত কর প্রশাসন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। দেশীয় ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রবৃদ্ধি অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ানোয় শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রাকে 'চটকদার ও অবাস্তব' উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্বল আর্থিক নীতি ও দুর্নীতির কারণে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেখানে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বা তারও কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, সেখানে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও বাস্তবসম্মত নয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করাকে সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি উন্নয়নের চেয়ে দুর্নীতি ও অপচয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। তাঁর অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও অপচয় চলে আসছে এবং অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে অর্থ ছাড়ের কারণে সেই প্রবণতা আরও বাড়ে।
করের বোঝা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ন্যূনতম ব্যক্তিগত কর হার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পের কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনমুখী খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এলপিজির ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি এবং তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামালের শুল্ক বৃদ্ধিও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেট বাস্তবায়নের সফলতা তিনটি 'নড়বড়ে স্তম্ভের' ওপর দাঁড়িয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা—এই তিন ক্ষেত্রেই সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত তাদের প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের তথ্যও তুলে ধরে। দলটির দাবি, সরকারি বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, আর তাদের ছায়া বাজেটে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সরকারি বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, যেখানে ছায়া বাজেটে ঘাটতি ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
জামায়াতের প্রস্তাবে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং আগামী বছর তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিক ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণের প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ এবং আর্থিক খাতে অনিয়মের কারণে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের দাবি জানান এবং বলেন, বর্তমান কাঠামোর মধ্যে বাজেট বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, বাজেটে ঋণনির্ভরতা ও ঘাটতির প্রকৃত চাপ আরও বেশি। তার মতে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও দুর্বল করবে।
তিনি বলেন, কর্পোরেট কর কমানোর মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ৩০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম হওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য শিক্ষা খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নৈতিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ না বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়া বাজেট সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়েছে এবং মূল বাজেটে তা বিবেচনার জন্যই এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মাওলানা আব্দুল হালিম, ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।