বৃহস্পতিবার
১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণমাধ্যমের বকেয়া সংস্কৃতি: দায় কার?

আকরাম হোসেন
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স

গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। এখানেই প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গল্প। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ খাতের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। বেতন-ভাতা ও উৎসব বোনাস বকেয়া রাখার সংস্কৃতি। বিশেষ করে ঈদের মতো বড় উৎসবকে সামনে রেখে যখন অন্য পেশার মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়, তখন অনেক সংবাদকর্মীকে পড়তে হয় অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটে। প্রশ্ন উঠছে—এই পরিস্থিতির দায় কার?

প্রথম দৃষ্টিতে আঙুল ওঠে মালিকপক্ষের দিকে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ দায়িত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত। কর্মীদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি আইনি ও মানবিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছু মালিকপক্ষ গণমাধ্যমকে কেবল ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন, যেখানে মুনাফা কমে গেলে প্রথমেই খরচ কমানোর পথ হিসেবে বেতন-ভাতা আটকে দেওয়া হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক ও কর্মীরা, যাদের বিকল্প আয়ের সুযোগও সীমিত।

তবে পুরো দায় মালিকপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদেখাই থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনাগত দুর্বলতা সংকটকে ত্বরান্বিত করে। অদক্ষ পরিকল্পনা, ভুল বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব না রাখা—এসব কারণে একটি সম্ভাবনাময় গণমাধ্যমও দ্রুত লোকসানের মুখে পড়ে। তখন মালিকপক্ষ ভর্তুকি কমাতে বাধ্য হয়, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মীদের বেতন ও সুবিধার ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহিতার অভাব। অনেক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো নেই। ফলে কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, কে দায়ী-তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে দায় এড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়, আর বকেয়া সংস্কৃতি যেন এক স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত হয়।

এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, মালিকপক্ষকে গণমাধ্যমকে কেবল মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ম্যানেজমেন্ট গড়ে তুলতে হবে, যারা সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে টেকসই পথে পরিচালিত করতে পারবে। তৃতীয়ত, শ্রম আইন ও সাংবাদিকদের অধিকার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, গণমাধ্যমের বকেয়া সংস্কৃতি কোনো একক পক্ষের দায় নয়; এটি একটি যৌথ ব্যর্থতার ফল। এই বাস্তবতা স্বীকার করে সমাধানের পথে এগোতে পারলেই কেবল সাংবাদিকদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক: আকরাম হোসেন, গণমাধ্যমকর্মী

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন