

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


থাইরয়েড পরীক্ষা (TSH, T3, T4) মূলত একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে করা হয়, যেখানে ল্যাব টেকনিশিয়ান সুচের সাহায্যে রোগীর হাতের শিরা থেকে সামান্য রক্ত সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণের জন্য পাঠান।
মেডিকেল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, নির্ভুল রিপোর্টের জন্য রোগীকে সকালের খালি পেটে রক্তের নমুনা দিতে হয় এবং পরীক্ষার দিন সকালে থাইরয়েডের নিয়মিত ওষুধ রক্ত দেওয়ার আগে খাওয়া নিষেধ।
এছাড়া, বায়োটিন বা মাল্টিভিটামিন জাতীয় কোনো সাপ্লিমেন্ট খেলে তা পরীক্ষার অন্তত ২-৩ দিন আগে বন্ধ রাখতে হয়, কারণ এগুলো হরমোনের মাত্রায় বিভ্রান্তিকর ফলাফল দেখাতে পারে, সাধারণত রক্ত দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পরীক্ষার সম্পূর্ণ রিপোর্ট পাওয়া যায়।
থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য মূলত কিছু রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে রক্তে থাইরয়েড হরমোনের সুনির্দিষ্ট মাত্রা পরিমাপ করা যায়।
TSH কী?
TSH-এর পূর্ণরূপ হলো Thyroid Stimulating Hormone (থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন)। এটি মূলত আমাদের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে তৈরি হয়। TSH-এর প্রধান কাজ হলো থাইরয়েড গ্রন্থিকে হরমোন তৈরি করার জন্য উদ্দীপিত বা নির্দেশ দেওয়া।
এক কথায়, শরীরের প্রয়োজন বুঝে মস্তিষ্ক এই হরমোনের মাধ্যমে থাইরয়েড গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কমে গেলে মস্তিষ্ক বেশি করে TSH তৈরি করে, আর হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে TSH-এর উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
T3 ও T4 কী?
T3 (Triiodothyronine) এবং T4 (Thyroxine) হলো থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে সরাসরি নিঃসৃত প্রধান দুটি হরমোন। আমাদের শরীরের কোষগুলো কীভাবে শক্তি ব্যবহার করবে (মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া), শরীরের তাপমাত্রা এবং হৃদস্পন্দন কেমন থাকবে- তা এই দুটি হরমোন নির্ধারণ করে।
রক্তে এই হরমোনগুলো দুই অবস্থায় থাকে: 'ফ্রি' (Free) বা মুক্ত অবস্থা এবং প্রোটিনের সাথে যুক্ত অবস্থা। চিকিৎসকেরা সাধারণত শরীরের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে Free T3 (FT3) এবং Free T4 (FT4) পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
রিপোর্ট কীভাবে বুঝবেন?
থাইরয়েড রিপোর্টের ফলাফল ল্যাবরেটরির রেফারেন্স রেঞ্জের (স্বাভাবিক মাত্রা) ওপর ভিত্তি করে বুঝতে হয়। সাধারণ গাইডলাইন অনুযায়ী:
হাইপোথাইরয়েডিজম (হরমোনের ঘাটতি): যদি আপনার রিপোর্টে TSH-এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে এবং Free T4 বা T3-এর মাত্রা কম থাকে, তবে তার মানে আপনার হাইপোথাইরয়েডিজম রয়েছে। অর্থাৎ, শরীর কম হরমোন তৈরি করায় মস্তিষ্ক বেশি বেশি TSH পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টি করছে।
হাইপারথাইরয়েডিজম (অতিরিক্ত হরমোন): যদি রিপোর্টে TSH-এর মাত্রা একদম কম বা শূন্যের কাছাকাছি থাকে এবং Free T4 বা T3-এর মাত্রা অনেক বেশি থাকে, তবে তা হাইপারথাইরয়েডিজম নির্দেশ করে। এর মানে থাইরয়েড গ্রন্থি নিজে থেকেই অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করছে, তাই মস্তিষ্ক TSH পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
কখন পরীক্ষা করা উচিত?
নিচের পরিস্থিতিগুলোতে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে থাইরয়েড প্রোফাইল (TSH, T3, T4) পরীক্ষা করা উচিত:
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ দ্রুত ওজন বৃদ্ধি বা কমে গেলে এবং সবসময় অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করলে।
অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমে গেলে এবং ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন বা অবসাদ দেখা দিলে।
নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড বা মাসিকের দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম হলে কিংবা গর্ভধারণে সমস্যা (Infertility) দেখা দিলে।
গলার সামনের অংশ অস্বাভাবিক ফুলে উঠলে কিংবা পরিবারে কারও থাইরয়েডের রোগ থাকার ইতিহাস থাকলে।
ইতিমধ্যে থাইরয়েডের ওষুধ খাচ্ছেন এমন রোগীদের ওষুধের ডোজ ঠিক আছে কি না, তা নিয়মিত (সাধারণত ৩ থেকে ৬ মাস পরপর) পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
থাইরয়েড পরীক্ষার জন্য সাধারণত সকালের খালি পেটে রক্তের নমুনা দেওয়া সবচেয়ে ভালো। আপনি যদি ইতিমধ্যে থাইরয়েডের ওষুধ খেয়ে থাকেন, তবে পরীক্ষার দিন সকালে রক্ত দেওয়ার আগে ওষুধ খাওয়া যাবে না; রক্ত দেওয়ার পর ওষুধ সেবন করতে হবে।
