

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অশ্লীল ও যৌন হয়রানিমূলক পোস্ট, ভিডিও, ফটোকার্ড ও মন্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান না হলে তার জীবনের দায়ভার শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের থাকবে বলে বক্তব্য দেন।
অন্তত ১০টি ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে নিয়মিত এসব কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। সেখান থেকে পোস্টগুলো বিভিন্ন প্রোফাইলে শেয়ার হয়ে আরও ছড়িয়ে পড়ছে এবং মন্তব্যের ঘরে অসংখ্য ব্যবহারকারী অশ্লীল, আপত্তিকর ও হয়রানিমূলক মন্তব্য করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মানসিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ১৮ জুন থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ৩০ দিনে শুধুমাত্র ‘আমাদের ত্রিশাল’ পেজ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ২৩টি পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পোস্টে মোট ৪ হাজার ৫৮৪টি রিঅ্যাক্ট এবং ৪৪৭টি মন্তব্য এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ১২টি পোস্ট ছিল নারী-সংশ্লিষ্ট। এসব পোস্টের মন্তব্যের একটি অংশে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যৌন হয়রানিমূলক, অশালীন ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও আইডি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘আমাদের ত্রিশাল’ পেজ ও গ্রুপ, পেজটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মোস্তাকিম হাসানের আইডিসহ মানিক হোসেন আকন্দ, শাহীন আলম, মিলন ২০০২, কাউসার আলী ও আল রিফাতের আইডি এবং এগুলো ছাড়াও আরও অসংখ্য ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত আইডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও আপত্তিকর পোস্ট, ভিডিও এবং ফটোকার্ড প্রকাশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব পোস্টে তারা এবং আরও অসংখ্য ফেসবুক ব্যবহারকারী কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও হয়রানিমূলক মন্তব্য করেছেন।
ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ঘটনার পর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর দাবি বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে আনার পরও তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এতে তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়ের যদি সুষ্ঠু সমাধান না হয়, তাহলে আমার জীবনের দায়ভার শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের থাকবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমান জানান, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পেজ ও আইডিগুলো শনাক্তকরণের কাজ চলছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি সাইবার পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
তবে ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য জানতে ত্রিশাল থানার ওসি মনসুর আহাম্মদকে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, বিষয়টি সাইবার সংক্রান্ত হওয়ায় এটি নিয়ে ডিবি বা র্যাব কাজ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। থানায় উন্নত প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণেই তিনি বিশেষায়িত ওই ইউনিটগুলোর শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন।"
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, সাইবার বুলিংয়ের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে আইসিটি সেল ও প্রক্টরিয়াল বডিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের যেসব ফেসবুক পেজ থেকে এ ধরনের বুলিং করা হচ্ছে, সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট যেসব পেজ বা গ্রুপ পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর অ্যাডমিন কারা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন পোস্ট কেন অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। কোনো পোস্ট অনুমোদনের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা উচিত। আইসিটি সেলকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর তদারকি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব অ্যাডমিনকে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।"
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী আহসান হাবীব বলেন, "সাইবার স্পেসে কাউকে যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য, অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র কিংবা এআই-নির্মিত বা সম্পাদিত (এডিটকৃত) তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, প্রচার বা প্রেরণ করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এ অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া এ ধরনের অপরাধ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির বিভিন্ন বিধানের আওতায়ও শাস্তিযোগ্য।"
এ ধরনের সাইবার হয়রানি বন্ধে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।