

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের খুনি সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে দেশেই অবস্থান করছিলেন। পুলিশের খাতায় ছিলেন মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি।
মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় নিয়ে ফাঁকি দিয়ে আসছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে বুধবার রাতে ধরা পড়ার পর তিনি নিজেই জানিয়েছেন দীর্ঘ সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশলের কথা।
হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বিদেশে পালিয়ে গেলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি দেশেই অবস্থান করছিলেন। দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে কয়েক বছর ধরে তিনি ঢাকাতেই অবস্থান করছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবারের সঙ্গে কাটানোর ইচ্ছা ছিল তার। বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে রয়েছেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে ডিবি সূত্র জানায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরদিন তিনি ভারতে পালিয়ে যান। কিছুদিন বিভিন্ন রাজ্যে ঘোরাঘুরি করে কলকাতায় অবস্থান নেন। সেখানে বিভিন্ন ভাড়া বাসায় অবস্থান নেওয়ার সময়ই বুঝতে পারেন দ্রুত সময়ে দেশে ফেরা অনেকটা অনিশ্চিত।
এজন্য সেখানে ভুয়া নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে নাগরিত্ব নেন। নিয়মিতই নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতেন। পরে ওই জাল নথির সাহায্যে তিনি পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন। অত্যন্ত ধুরন্ধর এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ভারতীয় পাসপোর্টে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ ও অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করার তার একটিই উদ্দেশ্য ছিল-যাতে বাংলাদেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তার আসল নামে খোঁজ করে দীর্ঘদিনেও কোনো হদিস পায়নি।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন মোজাফফর। কলকাতায় পলাতক জীবনের ১৭ বছর পার করার পর ১৯৯৮ সালে গোপনে দেশে আসেন। এরপর থেকে ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশেই আছেন বলে দাবি করেছেন।
এই সময়ে তিনি বিভিন্ন জেলায় ভাড়া বাসায় থেকেছেন। কিন্তু গোয়েন্দারা তার সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায় ভাবতে থাকেন-হয়তো মৃত্যুর আগে আর কেউই তার হদিস পাবে না। এজন্য শেষ জীবনটা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কয়েক বছর ধরে পরিবারের সঙ্গেই ডিওএইচএস এলাকায় শ্বশুরের ফ্ল্যাটে থাকছিলেন।
সেখানে এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। একই ফ্ল্যাটে থাকতেন তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও। তবে নিজের নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করায় কেউ ভাবতেই পারেনি ঢাকাতেই অবস্থান করছে এমন অপরাধী।
এদিকে মোজাফফরকে গ্রেফতারের মাধ্যমে অনেক অমীমাংসিত অধ্যায়ের জট খুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। জিয়া হত্যায় মোজাফফরের ভূমিকা কী ছিল এবং প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল? সেই সঙ্গে তার দীর্ঘ সাড়ে ৪ দশকের রহস্যে ঘেরা আত্মগোপন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৯৮৬ সালে ‘বাংলাদেশ : অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’ নামে একটি বই প্রকাশ হয়। এতে জিয়া হত্যাকাণ্ডের একটি বর্ণনা দিয়েছেন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। তার বর্ণনা অনুযায়ী, মোজাফফরের ভূমিকা হত্যার মুহূর্তে উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে আবার সার্কিট হাউজে যান। জিয়ার শোয়ার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরা হয়। এরপর জিয়া এবং নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার লাশ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মঞ্জুর ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেন। পরে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর মঞ্জুর ও সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তারা পরদিন ভোরে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালান।
সামনের জিপে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেফতার হন। এরই মধ্যে মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
সূত্র: যুগান্তর