বৃহস্পতিবার
১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাকরি ও টাকা কেড়ে নিয়ে পাকিস্তানিদের তাড়িয়ে দিচ্ছে আমিরাত

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানি শিয়া মুসলিমদের বহিষ্কারের অভিযোগ সামনে এসেছে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গ্রামীণ জেলা চাকওয়ালের বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক শিয়া মুসলিম সম্প্রতি আমিরাত থেকে দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরে তারা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। অনেকেরই এখন কোনো চাকরি নেই, সঙ্গে আনতে পারেননি নিজেদের মালামাল বা দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও।

বহিষ্কৃতদের দাবি, ইরান যুদ্ধ চলাকালে আমিরাত কর্তৃপক্ষ শিয়া মুসলিমদের লক্ষ্য করে ফেরত পাঠানোর অভিযান চালিয়েছে। এই ঘটনায় পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তারা ১০৩ জন পাকিস্তানির অভিবাসনসংক্রান্ত নথি, ভিসার তথ্য এবং ফ্লাইটের বিবরণ পর্যালোচনা করেছে। এসব ব্যক্তি নিজেদের শিয়া মুসলিম ও বহিষ্কারের শিকার বলে দাবি করেছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সাক্ষাৎকারে সবাই অভিযোগ করেন, দেশে ফেরত পাঠানোর আগে তাদের ব্যক্তিগত মালামাল কিংবা সঞ্চয় নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

পাকিস্তানের শিয়া রাজনৈতিক সংগঠন মজলিস ওয়াহদাত-ই-মুসলেমিন এর তৈরি একটি ডেটাবেসের তথ্যও পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৭ হাজারের বেশি পাকিস্তানি শিয়াকে আমিরাত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনটির মুখপাত্র মহসিন আবিদি বলেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

শিয়া সম্প্রদায়ের নেতাদের ভাষ্য, ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোতে শিয়াদের ওপর চাপও বেড়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর বহিষ্কারের ঘটনা আরও দ্রুতগতিতে ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই পাকিস্তানি শিয়াদের বহিষ্কারের জন্য নির্বাচন করেছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। বহিষ্কারের বিষয়ে রয়টার্সের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে কাউকে বহিষ্কার করেনি। তারা বলেছে, যেকোনো বহিষ্কারের ঘটনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো বিস্তারিত তথ্য না দিয়েই জানিয়েছে, চলতি বছর বহিষ্কারের সংখ্যা স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বহিষ্কৃত হাজার হাজার পাকিস্তানি নাগরিককে ফেরত পাওয়ার পর ইসলামাবাদ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে; যাদের অধিকাংশই শিয়া। তিনি বলেন, পাকিস্তানি সরকার কূটনৈতিক কারণে প্রকাশ্যে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেনি। তবে এর বেশি বিস্তারিত জানাননি তিনি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক উপ-পরিচালক মাইকেল পেজ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানি শিয়া বাসিন্দাদের বহিষ্কারের খবর গভীর উদ্বেগজনক। সংস্থাটি এই গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ওভারসিজ পাকিস্তানিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ লাখ পাকিস্তানি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস ও কাজ করেন। এই প্রবাসীরা পাকিস্তানের বার্ষিক রেমিট্যান্স হিসেবে ৬০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ দেশে পাঠান। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান।

ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে; যা প্রায় ৪ কোটি বা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সুন্নি শাসিত।

মানবাধিকার সংস্থা মেনার কর্মকর্তা ফালাহ সায়েদ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে শিয়া মুসলিমদের ওপর এই দমন-পীড়ন নতুন কিছু নয়। জেনেভাভিত্তিক এই সংস্থাটি বছরের পর বছর ধরে শিয়া বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের নির্বিচারে আটক ও জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই দমন-পীড়ন আরও তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আলি আহমেদ নকভি এবং তার স্ত্রী কুরাতুল আইন দুজনই শিয়া। তারা ২০২৪ সালে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কাজ করতে দুবাইয়ে যান। নকভি বলেন, চাকরি পরিবর্তনের কারণে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে কর্মসংস্থান ভিসা পরিবর্তনের আবেদন করার সময় তার স্ত্রীকে আটক এবং গত ১৮ এপ্রিল বহিষ্কার করা হয়।

তিনি বলেন, পাকিস্তানে ফেরার জন্য ফ্লাইটে ওঠার চেষ্টা করার সময় তাকেও আটক করা হয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি বহিষ্কারের মুখোমুখি হওয়া অন্যান্য শিয়াদের দেখতে পান। তিনি বলেন, তাকে আরও ৯৩ জন আটককৃত ব্যক্তির সাথে একটি ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়; যাদের সবাই ছিলেন শিয়া।

তিনি বলেন, কেন আমাদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, তা কেউ আমাদের বলেনি।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমের একটি শিয়া প্রধান এলাকা কুররাম জেলা; যা কয়েক দশক ধরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার। সেখানকার সম্প্রদায়ের নেতা মুসারাত হুসাইন বাণগাশ বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই অঞ্চল থেকে দেড় হাজার মানুষকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই যৌথ পরিবারগুলোর ভরণপোষণ করতেন।

তাদেরই একজন লাইক হুসাইন, যিনি ২০ বছর ধরে দুবাইয়ে কাজ করেছেন এবং একটি কার্গো ভ্যান কিনে ব্যবসা দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। হুসাইন বলেন, মাত্র একদিনে বা কয়েক মিনিটের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে গেল।

পাঞ্জাবের চাকওয়ালে ৩৮ বছর বয়সী একজন সাবেক দুবাই মেট্রো ম্যানেজার। যিনি ১৬ বছর আমিরাতে থাকার পর বহিষ্কৃত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি তার কয়েকজন প্রতিবেশীর সাথে বসে ছিলেন।

তাদের মধ্যে একজন আমিরাতে নির্মাণ খাতে কাজ করতেন। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা তাকে বেতন ও রেমিট্যান্স নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। ৪১ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারপর তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি ইরানে অর্থায়ন করি কি না। নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আমিরাত থেকে ফিরে আসা এই পাকিস্তানি শিয়া।

মেট্রো ম্যানেজার বলেন, পুলিশ তার ফোন কেড়ে নেয়, হাতে হাতকড়া পরায় এবং ৯ দিন আটকে রাখার পর তাকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন যাত্রীতে ঠাসা বাসে করে বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, চোখের পলকে আমি আবার শূন্যে নেমে এলাম।

সূত্র: রয়টার্স।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS England
Scheduled
19 Jul, 03:00 AM
VS
World Cup