


দুই বছর পরে ফিরে এলো আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আগের পরিচালনা পর্ষদ। এরসাথে ফিরে এলেন চট্টগ্রামভিত্তিক মীর গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুস সালামও।
তিনি বহুল বিতর্কিত ব্যাংক ডাকাত খ্যাত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ছেলের শ্বশুর। শুধু ফিরতে পারেননি এস আলমের ভাই আব্দুস সামাদ লাবু।
প্রায় দুই বছর আগে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন ব্যাংকটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পাঁচ সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদের হাতে।
এবার সেই স্বতন্ত্র পর্ষদ বহাল রেখেই আবারও পুরোনো উদ্যোক্তা-শেয়ারধারীদের ফিরিয়ে আনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আজ বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠিয়েছে। নতুন পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকদের পাশাপাশি পুরোনো উদ্যোক্তা-শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে ১৪ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন সদস্যদের অধিকাংশই চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী কেডিএস গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে ব্যাংকটির পরিচালনায় আবারও পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালের আগে যে পর্ষদে নেতৃত্ব দিতেন আব্দুস সামাদ লাবু, সেই পর্ষদের প্রায় সবাই ফিরলেও বাদ পড়েছেন শুধু তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, 'ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় আগের উদ্যোক্তাদের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আগে পুনর্গঠন করা হয়েছিল, সেগুলোর অনেক উদ্যোক্তাকে এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তারা সক্রিয় থাকায় তাদেরই আবার পর্ষদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।'
নতুন পর্ষদে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি কেডিএস গ্রুপের। গ্রুপটির চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান আবারও পরিচালক হয়েছেন। তাঁর বড় ছেলে সেলিম রহমানও ফিরেছেন। পর্ষদে ফিরেছেন খলিলুর রহমানের ছোট ভাই আহামেদুল হক এবং তার সম্বন্ধী বদিউর রহমান। বদিউর রহমান ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।
এ ছাড়া কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি হিসেবে মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি পরিচালক শরিফ উদ্দিন তসলিমকে নতুন পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুবাইভিত্তিক আল হারামাইন পারফিউমসের মালিক ও এনআরবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান নাসিরের ছেলে ইমাদুর রহমানকে আবারও পরিচালক করা হয়েছে।
পুরোনো পরিচালকদের মধ্যে আরও রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, লিয়াকত আলী চৌধুরী এবং এনায়েত উল্লাহ।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্বল হয়ে পড়া কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ছিল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকও। সে সময় পাঁচ সদস্যের একটি স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে ব্যাংকটির দায়িত্ব দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিতর্কিত প্রভাব থেকে ব্যাংকটিকে বের করে আনা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, গত প্রায় দুই বছরে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। সেই বিবেচনায় উদ্যোক্তা-পরিচালকদের আবারও পর্ষদে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে ব্যাপক আলোচনা ছিল। গ্রুপটির কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদের ভাই আবদুস সামাদ লাবু দীর্ঘদিন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন।
একই সময়ে কেডিএস গ্রুপের খলিলুর রহমান ও তাঁর ছেলে সেলিম রহমানও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাইফুল আলম মাসুদ ও খলিলুর রহমানের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার একই গ্রামে।
সর্বশেষ পুনর্গঠনে লাবু বাদ পড়লেও তাঁর সময়ের প্রায় সব উদ্যোক্তা-পরিচালকই আবার পর্ষদে ফিরেছেন। ফলে ব্যাংকটির পরিচালনায় পুরোনো উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর প্রভাব আবারও শক্তিশালী হলো। তবে এবার তাদের সঙ্গে স্বতন্ত্র পরিচালকরাও বহাল থাকছেন। নতুন এই কাঠামোতে ব্যাংকটির পরিচালনায় কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা কিংবা পর্ষদের পরিচালকও বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মূখ্য কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এনপিবি নিউজকে বলেন, 'আব্দুস সামাদ লাবু দেশে থাকলে তাকেও হয়তো বোর্ডে নিয়ে আসতো। তিনি দেশে না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্ভবত এই রিস্কটি নিতে পারেনি।
পুরনোদের কেন ফিরিয়ে আনতে হলো এর কোনো ব্যাখ্যা আমি জানি না। যদি পুরনোরাই ভালো হতো, তবে ব্যাংকের তৎকালীন বোর্ড কেন ভেঙ্গেছিল? এর কোনো জবাব দিবে বাংলাদেশ ব্যাংক?'
একই বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহ আহমেদ এনপিবি নিউজকে বলেন, 'বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো ভালো মনে করেছে তাই ফিরিয়ে এনেছে। যারা এসেছে তারা সবাই ব্যবসায়ী। বড় ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংক নিরাপদ থাকবে এমন ভেবে থাকতে পারে, আমি জানি না। এস আলমের আত্মীয় স্বজন আছে বলেই সে খারাপ এমনতো হতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত মনিটরিং করবে এখানে এইটাই আমার চাওয়া।'
তবে এ নিয়ে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাই করছেন তুমুল সমালোচনা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাহী পরিচালক এনপিবি নিউজকে বলেন, 'চক্ষু লজ্জার দায়ে সম্ভবত এস আলমের ভাইকে ফেরানো হয়নি। নইলে পারলে এস আলমকেই নিয়ে আসবে মনে হয়। অজুহাত দিয়ে এই পুরনোদের ফিরিয়ে আনার কোনো মানে হয় না।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা গেল দুই বছরে ভালো হয়েছে, এবার এই ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যারা খারাপ করেছিল তাদের কাছে সুস্থ সবল ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া হলো। তারা আবার দূর্বল করে দিক এইটাই কী চায় কেউ কেউ?'