

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যরাত। চারপাশ নিস্তব্ধ, আর আপনি মগ্ন গভীর ঘুমে। হঠাৎ পায়ের ডিম বা কাফ মাসলে তীব্র ও অবশ করা এক টান! প্রচণ্ড ব্যথায় ছটফট করে উঠে বসলেন বিছানায়, অথচ পা সোজা করার ন্যূনতম ক্ষমতাটুকুও নেই।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি, এমন মানুষ খুঁজেই পাওয়া যাবে না।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সাধারণ মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরের বড় কোনো সতর্কবার্তা।
গভীর ঘুমে হঠাৎ পায়ের ডিমে (কাফ মাসল) তীব্র টান ধরে প্রচণ্ড ব্যথায় ঘুম ভেঙে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নকটার্নাল লেগ ক্র্যাম্পস’ (Nocturnal Leg Cramps) বা রাতে পায়ে টান ধরা বলা হয়। পায়ের পেশি হঠাৎ শক্ত বা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণেই এই যন্ত্রণা তৈরি হয়।
ছবি সংগৃহীত
পায়ের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পেছনের অংশে যে নরম ও মাংসল অংশটি থাকে, তাকেই সাধারণত পায়ের ডিম বা কাফ মাসল (Calf Muscle) বলা হয়।
গ্যাস্ট্রোকনেমিয়াস (Gastrocnemius) এবং সোলেয়াস (Soleus) নামক প্রধান দুটি পেশি নিয়ে এই অংশটি গঠিত।
হাঁটাচলা, দৌড়ানো, লাফানো এবং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং রক্তকে নিচের দিক থেকে হৃদপিণ্ডে ফিরিয়ে দিতে এই পেশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পানির ঘাটতি (Dehydration): শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে পেশি তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়।
খনিজের অভাব (Electrolyte Imbalance): রক্তে পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম বা ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি হলে পেশির সংকোচন-প্রসারণ ব্যাহত হয়।
পেশির অতিরিক্ত ক্লান্তি: সারাদিন একটানা দাঁড়িয়ে কাজ করা, বেশি হাঁটাচলা বা হাই হিল জুতো পরার কারণে পায়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়া।
ভুল ভঙ্গি (Poor Posture): দীর্ঘক্ষণ পা আসন করে বসে থাকা বা ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত ভঙ্গিতে পা রাখার ফলে রক্ত সঞ্চালনে বাধা পাওয়া।
অন্যান্য শারীরিক সমস্যা: গর্ভাবস্থা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা কিডনির সমস্যা।
যদি সপ্তাহে ৩-৪ বার বা তার বেশি এই সমস্যা হয়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা (যেমন: Serum Electrolytes, Vitamin D, HbA1c) করানো উচিত। এটি অনেক সময় নার্ভের সমস্যা বা ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
ছবি সংগৃহীত
১. ধীরে ধীরে স্ট্রেচিং করুন: আতঙ্কিত না হয়ে পা সোজা করুন এবং পায়ের পাতাটি নিজের দিকে (হাঁটুর দিকে) হালকা টেনে ধরে রাখুন। পেশি দ্রুত শিথিল হবে।
২. আলতো মালিশ: হাতের বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া পেশির ওপর হালকা চাপ দিয়ে মালিশ করুন।
৩. সেঁক দিন: পেশি নরম করতে গরম পানির সেঁক (Hot Compress) দিতে পারেন। এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়বে। আর তীব্র ব্যথা কমাতে বরফ বা আইস প্যাক ব্যবহার করুন।
৪. একটু হাঁটুন: সম্ভব হলে ঘরের মেঝেতে গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার চেষ্টা করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান: প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার পানি পান করুন।
সঠিক ডায়েট: শরীরে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের জোগান ঠিক রাখতে প্রতিদিনের খাবারে ডাব, কলা, লেবু বা সবুজ শাকসবজি রাখুন।
ছবি সংগৃহীত
ঘুমানোর আগে ব্যায়াম: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পায়ে হালকা স্ট্রেচিং বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
মাঝরাতের এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি পান এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মতো সাধারণ কিছু অভ্যাস বদলালেই এই সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
তবে রাতের এই পায়ের টানকে কেবলই একটি সাময়িক অস্বস্তি ভেবে দিনের পর দিন এড়িয়ে যাওয়া একদমই উচিত নয়। যদি ঘরোয়া উপায়েও এই সমস্যার সমাধান না হয় এবং এটি নিয়মিত আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, তবে বুঝতে হবে শরীর ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো বড় রোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাই সময় থাকতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, সুস্থ থাকুন এবং প্রতিটা রাত উপভোগ করুন নিশ্চিন্ত ও আরামের ঘুমে।
