রবিবার
১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসার পর সুন্দরবনে ফিরল সেই বাঘিনী

বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
রয়েল বেঙ্গল টাইগার
expand
রয়েল বেঙ্গল টাইগার

রোববার সকাল ৮টা। বাগেরহাটের মোংলা ফুয়েল জেটি থেকে লোহার খাঁচায় বন্দি করা আহত বাঘিনীকে বন বিভাগের ট্রলার এম এল সোয়াচ-২ তে করে নদী পথে সুন্দরবনে রওনা দেয় বন বিভাগ। বেলা সাড়ে ১১টায় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আন্ধারমানিক টহল ফারি সংলগ্ন আন্দারিয়া খালে সোয়াচ-২ সহ বন বিভাগের অন্যান্য জলযান নোঙ্গর করা হয়। সবার নজর বাঘের খাঁচার দিকে। কখন হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন খাঁচা থেকে সুন্দরবনের রানী লাফিয়ে আপন ঠিকানায় ফিরবেন।

নানা প্রক্রিয়া শেষে দুপুর ১২টার দিকে বাঘটিকে সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য লোহার খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হয়। বাঘটি খাঁচা থেকে বের হয়ে যাতে লোকালয়ের দিকে না যায় এবং সরাসরি বনে যায় এ জন্য বাঘ বহনকরা ট্রলারটিকে চারদিক দিয়ে ঘিরে রাখে বন বিভাগ, বন প্রতিমন্ত্রী ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বেশকিছু জলযান।

তবে অনেক চেষ্টার করেও বাঘটি খাঁচা থেকে বের হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে দুপুর একটার দিকে ট্রলারটিকে বনের আরও পাশে নেওয়া হয়। খাঁচার এক পাশ উচু করলে বাঘটি লাফিয়ে বনের মধ্যে চলে যায়। মুহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায় বাঘটি।

বাঘটিকে অবমুক্তের সময়, পরিবেশ বন, ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে শনিবার দিবাগত রাতে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে বাঘটিকে ট্রাংকুলাইজার গানের মাধ্যমে অজ্ঞান করা হয়। ভোরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে সড়ক পথে বাঘটিকে মোংলায় আনা হয়।

বন বিভাগ সূত্রে জানাযায়, গেল ৩ জানুয়ারি, শনিবার দুপুরের পর বন বিভাগের কাছে খবর আসে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল থেকে আধা কিলোমিটার ভেরতে বৈদ্যমারি ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি এলাকায় হরিণ শিকারের ফাঁদে একটি বাঘ আটকে আছে। খবরের পরপরই শুরু হয় তল্যাশি। তবে উদ্ধার কাজ শুরু হতে দিন পার হয়ে যায়। অবশেষে পরের দিন ৪ জুন, রবিবার দুপুরের আগমুহুর্তে খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের নেতৃত্বে বন বিভাগের ভেটেনারি সার্জনসহ উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। ট্রানকুইলাইজার গানের সহযোগিতায় অজ্ঞান করা হয় ক্ষিপ্র বাঘটিকে। দুই ঘন্টার বেশি সময় অভিযান চালিয়ে ২টা ৫০ মিনিটে নিয়ে বাঘটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় শরকির খাল পাড়ে। হাজারও জনতার ভীড়ে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে লোহার খাঁচায় আটকানো হয় বাঘটিকে। পরে বাঘটিকে পরে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে বনকর্মীদের সেবায় আস্তে আস্তে সুস্থ্য হতে থাকে বাঘটি।l প্রায় ৬ মাসের সেবা ও যত্নে স্ত্রী বাঘটি এখন পুরোপুরি সুস্থ্য হয়। এই সুস্থ হওয়াী প্রক্রিয়া খুব সহজ ছিলনা বলে জানান গাজীপুর সাফারি পার্কের ভ্যাটেনারি সার্জন হাতেম সাজ্জাত মোঃ জুলকারনাইন।

তিনি বলেন, বাঘটির পায়ে বেশ বড় ক্ষত ছিল। শরীরেও নানা সমস্যা ছিল। প্রথম দিকে বাঘটি খাচ্ছিল না। তার রক্ত পরীক্ষাসহ নানা পরীক্ষা করতে হয়েছে। প্রথম দিকে কলিজা, ছোট ছোট টুকরো গোশত, পরবর্তীতে ছোট প্রানি এবং এক পযার্য়ে ছাগল ও শুকর খেতে দেওয়া হয় বাঘটিকে। ৬ মাসের চেষ্টায় বাঘটিকে আমরা সুস্থ করতে পেরেছি।

ফাঁদে আটকা বাঘটিকে উদ্ধার করা থেকে অবমুক্ত পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো: রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বাঘটি উদ্ধার করাই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। হাজার হাজার লোক বাঘ দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। সব বাঁধা উপেক্ষা করে বাঘ উদ্ধার করি। সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাঘটি সুস্থ হয়। এটাই প্রথম কোন বাঘ বনের বাইরে যাওয়ার পরে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হল। এটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের।

প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী বলেন , অসুস্থ বাঘটিকে সুস্থ করে সুন্দরবনের উন্মুক্ত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল । তারপরও সকলের চেষ্টায় আমরা পেরেছি, এটা বন বিভাগের জন্য একটি মাইল ফলক। বন বিভাগের সকল প্রাণী ও জীব বৈচিত্র রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তিনি আরও বলেন, সুস্থ বাঘটিকে এখন বাঁচতে হবে নিজের মত করে। প্রকৃতিতে বিচরণ ও শিকার করে খেতে হবে৷ আমরা বিশ্বাস করি বাঘটি সুস্থ ভাবে আরও অনেকদিন সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকবে। আর এজন্য তার গতিবিধি শনাক্ত করার জন্য ২০টি ক্যামেরার মাধ্যমে ৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মনিটরিং করা হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাঘটিকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এটাই আমাদের আনন্দ। আসলে বন্যেরা বনে সুন্দর। আর সুন্দরবনে আজ একটি ইতিহাস সৃষ্টি হল। আমরা বিশ্বাস করি এখানে বাঘটি ভাল থকবে।

এর আগেও সুন্দরবন থেকে একটি বাঘ ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই বাঘটিকে আর ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS Spain
Scheduled
15 Jul, 01:00 AM
VS
World Cup