বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারবালার রক্তাক্ত ইতিহাস, কী ঘটেছিল সেদিন

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

ইসলামের ইতিহাসে কারবালার যুদ্ধ একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর (৬১ হিজরির ১০ মহররম) আধুনিক ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত হোসাইন ইবনে আলী (রা.) এবং উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর মধ্যে এই অসম যুদ্ধ হয়।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও কারণ:

উমাইয়া খলিফা প্রথম মুয়াবিয়া মৃত্যুর পূর্বে তার পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। কিন্তু হযরত হোসাইন (রা.) সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবির সন্তানরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন, কারণ এর ফলে খিলাফত ব্যবস্থা বংশতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে রূপ নিচ্ছিল।

মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ জোরপূর্বক আনুগত্য দাবি করলে হযরত হোসাইন (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং মক্কায় চলে যান।

এই সময় কুফাবাসী ইয়াজিদের অন্যায্য শাসনের বিরুদ্ধে হযরত হোসাইন (রা.)-কে খিলাফতের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য কুফায় আসার আমন্ত্রণ জানায় এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।

কুফাবাসীদের চিঠিতে আশ্বস্ত হয়ে তিনি স্ত্রী, সন্তান, বোন ও ঘনিষ্ঠ অনুচরসহ প্রায় ২০০ জনের একটি কাফেলা নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন (যার মধ্যে সশস্ত্র যোদ্ধা ছিলেন মাত্র ৭০-৭২ জন)।

কারবালার অবরোধ ও পানির সংকট:

কুফার পথে পৌঁছানোর আগেই কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশে উমাইয়া বাহিনী হযরত হোসাইন (রা.)-এর কাফেলাকে বাধা দেয়। ২ অক্টোবর তাকে কারবালার তপ্ত মরুভূমিতে শিবির স্থাপন করতে বাধ্য করা হয়।

শীঘ্রই ওবায়দুল্লাহর ৪,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী সেখানে এসে পৌঁছায়। রক্তপাত বন্ধের উদ্দেশ্যে হযরত হোসাইন (রা.) তিনটি প্রস্তাব দেন:

১. তাকে মদিনায় ফিরে যেতে দেওয়া হোক।

২. তুর্কি সীমান্তের কোনো দুর্গে অবস্থান করতে দেওয়া হোক।

৩. অথবা ইয়াজিদের সাথে সরাসরি আলোচনার জন্য দামেস্কে পাঠানো হোক।

কিন্তু ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ এই প্রস্তাবগুলো নাকচ করে দিয়ে শর্ত দেয় যে, হযরত হোসাইন (রা.)-কে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে।

হযরত হোসাইন (রা.) ঘৃণাভরে এই অন্যায় আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর ইয়াজিদ বাহিনী ফোরাত নদীর পানি যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে পানি ও খাবারের চরম হাহাকার শুরু হয়।

হোসাইন (রা.) স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আমি যুদ্ধ বা ক্ষমতা দখলের জন্য আসিনি, বরং খিলাফতের পবিত্র ঐতিহ্য রক্ষা করাই আমার লক্ষ্য।"

নির্মম হত্যাকাণ্ড ও শাহাদাত:

১০ মহররম (আশুরা) ইয়াজিদ বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ক্ষুদ্র কাফেলার ওপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটি ছিল একটি চরম অসম যুদ্ধ। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত হযরত হোসাইন (রা.) বীরত্বের সাথে লড়াই করেন।

অবশেষে সিনান ইবনে আবি আনাস নাখায়ি এবং খাওলি ইবনে ইয়াজিদের বর্বরতায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। পাপিষ্ঠরা তার পবিত্র মস্তক শরীর থেকে দ্বিখণ্ডিত করে বর্শার ফলকে বিদ্ধ করে ওবায়দুল্লাহর দরবারে এবং পরে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে পাঠায়। পরবর্তীতে তার ছিন্ন মস্তক কারবালাতেই এনে দাফন করা হয়।

এই নির্মম যুদ্ধে হযরত হোসাইন (রা.)-এর একমাত্র অসুস্থ ছেলে হযরত জায়নুল আবেদীন (রহ.) ছাড়া পরিবারের পুরুষ সদস্যসহ প্রায় ৭০ থেকে ৭২ জন শহীদ হন। শাহাদাতের পর হযরত হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র দেহে ৩৩টি বর্শা ও ৩৪টি তরবারির আঘাত এবং অসংখ্য তীরের জখম পাওয়া যায়।

জুবাইর ইবনে বাক্কার (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, চতুর্থ হিজরির শাবান মাসের ৫ তারিখে জন্ম নেওয়া এই মহান ইমাম মাত্র ৬১ হিজরি সালে শাহাদাত বরণ করেন।

পরবর্তী প্রতিক্রিয়া:

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে এর সাথে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীর অত্যন্ত করুণ ও অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছিল। হোসাইন (রা.)-এর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইরাকে পরবর্তীতে 'তাওয়াবিন' (অনুতাপকারী দল) এবং মুখতার আল সাকাফির নেতৃত্বে বড় ধরনের বিদ্রোহ গড়ে ওঠে।

কারবালার এই ঘটনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি কেন্দ্রীয় ধর্মীয় ও আবেগীয় বিষয়ে পরিণত হয়, যা তারা প্রতি বছর ১০ দিনব্যাপী শোক পালনের (আশুরা) মাধ্যমে স্মরণ করে।

অন্যদিকে, সুন্নি মুসলমানরাও একে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা মনে করে এবং হযরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক এবং মহান শহীদ হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকেই ছিল, তবে কারবালার ঘটনা একে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারবালার মূল শিক্ষা হলো- যেকোনো মূল্যে অন্যায়, জুলুম ও অসত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথ অবলম্বন করা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Curaçao VS Ivory Coast
Scheduled
26 Jun, 02:00 AM
VS
World Cup