সোমবার
১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শহীদ মিনারে ‘ছাত্রলীগ কর্মীর’ লাশ, যা জানা গেল

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম
নিহত সিহাবের শোকে পাগলপ্রায় তার মা। ছবি: সংগৃহীত
expand
নিহত সিহাবের শোকে পাগলপ্রায় তার মা। ছবি: সংগৃহীত

গত রোববার (৯ আগস্ট) সকালে মানিকগঞ্জের জাগীর ইউনিয়নের মেঘশিমুল গ্রামে ধলেশ্বরী মাঠের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভে ঝুলন্ত অবস্থায় এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার হয়।

ওই কিশোরের নাম সিহাব হোসেন (১৫)। মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় কিশোরের নানা মো. আকরাম হোসেন বাদী হয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

এদিকে সিহাবের লাশ উদ্ধারের পর তার ঝুলন্ত অবস্থার ছবি পোস্ট করে চলছে নানা ধরনের প্রচারণা। আওয়ামীপন্থিদের দাবি, ছাত্রলীগ করার কারণে ওই কিশোরকে হত্যার পর শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে রেখেছে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ঝুলন্ত একটি প্রতীকী ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘৯ আগস্ট ২০২৬ , মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ছাত্রলীগ কর্মী শিহাবকে নির্মমভাবে হত্যা করেশহীদ মিনারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখে বিএনপি ও জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসীরা..আর কত দায়মুক্তি?’

নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ফেসবুক পেইজে ঝুলন্ত একটি প্রতীকী ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ছাত্রলীগ কর্মী শিহাবকে শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে বিএনপি জামায়াতের সন্ত্রাসীরা। বিএনপি-জামায়াতের এই রক্তের পিপাসা মিটবে কবে?’

সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ঝুলন্ত ছবিটি পোস্ট করে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ছাত্রলীগ কর্মী শিহাবকে হত্যার পর শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে রেখেছে জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা।’

এদিকে এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াতপন্থি অনেকে একই ছবি পোস্ট করেছেন ভিন্ন দাবিতে। তারা লিখছেন, ‘ছাত্রলীগ ছেড়ে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ায় মানিকগঞ্জের কিশোর শিহাবকে তুলে নিয়ে হত্যা করে শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে দিয়েছে লীগ সন্ত্রাসীরা।’

নৌকা ভ্রমণে যেতে মা, নানা ও বন্ধুর কাছে টাকা চেয়েছিলেন সিহাব

নিহত সিহাব নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। গত এক বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে বিভিন্ন কাজ করেছেন। সর্বশেষ মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড মাছবাজারে এক ব্যবসায়ীর দোকানে কর্মচারী হিসেবে মাছ কাটার কাজ করতেন। গত শনিবার দোকান থেকে ছুটি নেন সিহাব। এর পরদিন সকালে তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

সিহাব তার বন্ধুদের সাথে নৌভ্রমণে যাওয়ার জন্য তার মা, নানা ও বন্ধুদের কাছে ৫০০ টাকা চেয়েছিলেন বলে তারা জানিয়েছেন।

সিহাবের বন্ধু শাফিনের সাথে সেই টাকা চাওয়ার মেসেজের স্ক্রিনশট ও স্ক্রিনরেকর্ড সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট।

সংগৃহীত স্ক্রিনশটে দেখা যায়, সিহাব তার ফেসবুক আইডি Danger Sihab থেকে মেসেঞ্জারে তার বন্ধু শাফিনের ফেসবুক আইডি Ahmed’s Safin-কে মেসেজে লিখেন, ‘Tk hobe tor kase 500’। জবাবে শাফিন লিখেন, ‘আমি টাকা কই পাবো’। এর জবাবে সিহাব লিখেন, ‘Qq, Tor mar kase ca, Dekh dey nky’। এই মেসেজের পরে আর কোনো রিপ্লাই দেননি শাফিন। এই মেসেজের সময় ওই স্ক্রিনশটে উল্লেখ নেই। শাফিন জানিয়েছে, এই কথোকপকথন শাফিনের সাথে সিহাবের হয়েছে শনিবার বিকেল ৫/৬ টার দিকে।

এরপর রাত ১১ টা ৩ মিনিটে সিহাব তার মেসেঞ্জার থেকে শাফিনকে লিখেন, ‘ভাগিনা, ভালো থাকিস, আর ভুল করলে মাফ কইরা দিস, এক নজোর দেখবার ইছা হইলে সহিধ মিনারে আয়’’।

এরপর শাফিনের দিক থেকে কোনো রিপ্লাই দেখা যায়নি। শাফিনের ভাষ্য, তিনি সকালে এই মেসেজ দেখেছেন; ততক্ষণে সিহাবের ঝুলন্ত মরদেহের খবর ছড়িয়েছে।

প্রসঙ্গত, সিহাব ও শাফিন সম্পর্কে মামা-ভাগিনা। তবে সমবয়সী হওয়ায় একে অপরের বন্ধু হিসেবেই চলফেরা করতেন।

এছাড়া সিহাব তার মা মুক্তা বেগম, নানা আকরাম হোসেনের কাছেও টাকা চেয়েছিলেন।

সিহাবের মা মুক্তা বেগম বলেন, ‘সে শনিবার রাতে সাড়ে ৯টার দিকে আমাকে বললো, মা ৫০০ টাকা দাও আমারে। আমি আবার বললাম কিসের জন্য? পরে বলল- ‘আমার বন্ধুরা দাঁড়াইয়া আছে ওদের সাথে একটু ঘুরতে যামু আড্ডা দেওয়ার জন্য’। আমি আবার বকা দিলাম যে দুই দিনে ৯০০ টাকা খরচ করছ। আজকে আমার ৫০০ টাকা আমি কইত্থেকে দিমু। যদি ৫০ টাকা ১০০ টাকা হয় তাইলে আমারে বলো অথবা নানার কাছ থেকে নিয়া দেই।’

তিনি বলেন, ‘পরে বললাম যে ‘বাবা ভাত খাও’। কয় ‘না, আম্মা বন্ধুরা দাঁড়াইয়া আছে যাই’। আমি আবার হাতটা ধরলাম। হাতটা ছাড়াইয়া ও বাইর হইয়া গেলো। ওর বন্ধুদের সাথে আগের রাতেও (শুক্রবার) ঘুমাইছে। ওইদিন (শনিবার) এই বইলা গেলো যে– বন্ধুদের সাথে ঘুমাবে। আমি ওরে বললাম যে ‘ঘুমাবি না কি হইছে’ পরে বলল কী যে ‘কালকে ওই বন্ধুর সাথে ঘুমাইছি মা, আইজকার রাইতটা ওই বন্ধুর সাথে ঘুমামু। ঘুমায়ে কালকে আমার বাড়িতে আইসা ঘুমামু তোমার কোলে’। এইতো এতটুকুই কথা।’

নানা আকরাম হোসেন বলেন, ‘ওইদিন মোটামুটি রাইত বাজে ৯ টার মতন। ও আমারে বলতেছে যে ‘নানা ৫০০ টাকা লাগবো’। আমি বললাম ‘ভাই তুমি টেকা দিয়া কি করবা?’ বলল যে ‘নৌকা বাইচে যামু’। আমি বললাম, ‘আইচ্ছা ঠিক আছে তুমি নৌকা বাইচে যাইবা ভালো কথা, যেদিন যাইবা তুমি তার আগের দিন আমারে কইও আমি তোমারে ৫০০ টাকা দিয়া দিমু। তাছাড়া তোমারে যদি আমি এই মুহূর্তে টেকা দেই তুমি বন্ধু-বান্ধব নিয়া ভাইঙ্গা ফালাইয়া দিয়া কাইলকা আবার আইসা কইবা আমি নৌকা বাইচে যামু ৫০০ টাকা দাও। তো আজকে আমার কাছে নাই এখন আমি দিতে পারুম না’। তখন এই কথা বলার পরে ও কইল ‘তয় আমি আজকে রাত্রে বন্ধুদের কাছে থাকুম’। আমি কইলাম যে ‘তুমি বাইরে কোথাও থাইকো না দেশের অবস্থা ভালো না তুমি বাড়িতে আইসা ঘুমাও’। কয় ‘না আমি আজকে রাইতটা বন্ধুর কাছে ঘুমামু কাইলকা থাইকা আমি আর কোথাও যামু না, আমি বাড়িতেই ঘুমামু’। এই কইয়া ও বাইর হইয়া গেল। পরে সকালে ঝুলন্ত অবস্থায় পাইলাম।’

মাছ ব্যবসায়ী মনির হোসেন (যার দোকানে সিহাব কাজ করতেন) বলেন, ‘পোলাডা আমার দোকানে কাজ করতো। ও শুক্রবার দিন পর্যন্ত কাজ কইরা গেছে। শনিবার দিন তো ছুটি নিছিলো। পরে রবিবার সকালবেলা শুনতে পারলাম সিহাব নাকি শহীদ মিনারে ঝুইলা মারা গেছে।’

আগের রাতে তাদের সাথে ছিলেন না সিহাব—দাবি দুই বন্ধুর

মা এবং নানার কাছে নৌ ভ্রমণে যাওয়ার জন্য যে সিহাব টাকা চেয়েছিলেন; নৌ ভ্রমণে সত্যিই যাওয়ার কথা ছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে দুই বন্ধু শ্রাবণ ও শাফিন নিশ্চিত করেছেন তারা ১০ আগস্ট (আজকে) নৌ ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল। সিহাবের মৃত্যুতে তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।

সিহাবের বন্ধু, শ্রাবণ বলেন, ‘আমরা এলাকার ভাই-ব্রাদারদের সাথে নৌ ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল ১০ তারিখ। এখন তারিখ পিছিয়ে ১২ তারিখ করা হয়েছে। তবে ১২ তারিখও যাবো কিনা নিশ্চিত না।’

এদিকে সিহাবের পরিবারের দাবি শনিবার রাতে বন্ধুদের সাথে থাকবে বলে বাসা থেকে বের হন সিহাব। আগের রাতেও তাদের সাথে ছিলেন। এ ব্যাপারে দুই বন্ধু শ্রাবণ ও শাফিন শুক্রবার রাতে একসাথে থাকলেও শনিবার একসাথে ছিলেন না বলে জানান।

শাফিন বলেছেন, ‘শুক্রবার আমি, শ্রাবণ ও সিহাব শ্রাবণের বাসায় একসাথে ছিলাম। তবে শনিবার আমি ওদের সাথে ছিলাম না। আমার বাসা ওদের বাসা থেকে দূরে আছে। আমি আমার বাসায় ছিলাম।’

শ্রাবণও একই তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে আমরা একসাথে ছিলাম আমার বাসায়। তবে শনিবার ওরা ছিল না।’

‘সিহাব কোনো রাজনীতি করতো না’

সিহাবের পরিবার, দুই বন্ধু এবং সিহাবের দোকানের পরিচালক ও পুলিশ জানিয়েছে সিহাব কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর গত প্রায় বছরখানেক থেকে মাছের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন।

সিহাবের মা মুক্তা বেগম বলেন, ‘এতটুকু পোলাপান কী রাজনীতি করবে? আমার ছেলে মাছের ব্যবসায় মাছ কাটে, বাড়িতে আসে যায়, একটু আধটু বন্ধুবান্ধবের লগে আড্ডা দেয়। সে কোনো রাজনীতি করতো না।’

নানা আকরাম হোসেন বলেন, ‘আমি বিএনপির একজন কর্মী ও পেশায় মাছ ব্যবসায়ী। তবে আমার নাতি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নয়। ও রাজনীতি পছন্দও করতো না।’

মাছ ব্যবসায়ী মনির হোসেন (যার দোকানে সিহাব কাজ করতো) বলেন, ‘ও কোনো সময় রাজনীতি করতো না। ও আমার লগে সকালে আসতো আবার রাত্রে বাসায় চলে যেত। আমার পাশেই ওর নানার বাসা।’

দুই বন্ধু শ্রাবণ ও শাফিনও একই রকম কথা বলেছেন। শাফিন বলেন, ‘সিহাব কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না।’

যা বলছে পুলিশ

ঘটনার পর গতকাল রাতে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের অফিসিয়াল ফেসবুকে পেইজে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মানিকগঞ্জ থানাধীন জাগীর সাকিনে ধলেশ্বরী ব্রীজের দক্ষিণ পার্শ্বে খেলার মাঠে শহিদ মিনারে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ০১ জনের (পুরুষ) মৃত্যু। এই ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক অনুমান এটা আত্মহত্যা হতে পারে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে যা লেখা হচ্ছে সেসব অপপ্রচার। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

সূত্র: দ্য ডিসেন্ট

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন