বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আশুরা’তে প্রচলিত যত ভুল ধারণা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ ‘আশুরা’ মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক দিন। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সত্যের জয়, আল্লাহর বিশেষ রহমত এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহর আলোয় এ দিনটি পরিপূণ।

তবে, কালের পরিক্রমায় নানা লোককথা, অনির্ভরযোগ্য বই ও অতি-আবেগের মিশ্রণে এই মর্যাদাপূর্ণ দিনটিকে ঘিরে সমাজে বহু ভ্রান্ত ধারণা ও বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

নিচে এ সংক্রান্ত প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো এবং দলিলভিত্তিক সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা হলো:

১. আশুরার গুরুত্ব ও ফজিলত সংক্রান্ত ভ্রান্তি

ভুল ধারণা: আশুরার মর্যাদা কেবল কারবালার ঘটনার কারণেই প্রতিষ্ঠিত।

সঠিক তথ্য: ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনার বহু আগে থেকেই আশুরা ইসলামে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

দলিল: ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা এ দিনে রোজা রাখে। কারণ, এদিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

তখন তিনি বলেন, ‘মুসার ব্যাপারে আমরাই তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪)

ভুল ধারণা: মহররমের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখলে ১০ হাজার বছরের সওয়াব মেলে।

সঠিক তথ্য: মহররম মাসে নফল রোজার বিশেষ ফজিলত থাকলেও ১০ দিনে হাজার হাজার বছরের সওয়াব পাওয়ার এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

দলিল: বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) এ ধরনের বর্ণনাকে ‘মাওজু’ বা জাল বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। (আল-মাওজুয়াত)

২. নামাজ, রোজা ও বিশেষ ইবাদত সংক্রান্ত বিভ্রান্তি

ভুল ধারণা: শুধু ১০ তারিখে একটি রোজা রাখাই যথেষ্ট।

সঠিক তথ্য: কেবল ১০ মহররমে একটি রোজা রাখলে ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। তাই সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণের জন্য এর আগে বা পরে আরেকটি রোজা মেলানো উত্তম।

দলিল: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি যদি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)। এজন্য ওলামায়ে কেরাম ৯-১০ অথবা ১০-১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখার পরামর্শ দেন।

ভুল ধারণা: আশুরার রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ১০০ বা ১২ রাকাত নামাজ পড়া।

সঠিক তথ্য: আশুরার রাতে সুনির্দিষ্ট নিয়মে (যেমন প্রতি রাকাতে বিশেষ সূরা এতবার পড়া) নামাজ পড়ার কোনো বিধান ইসলামে নেই।

দলিল: ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.) এবং আল্লামা লখনবী (রহ.) আশুরাকেন্দ্রিক বিশেষ নামাজের সব বর্ণনাকে জাল ও বানোয়াট আখ্যা দিয়েছেন। (আল-মাওজুয়াত, আল-আসারুল মারফুআহ)

ভুল ধারণা: নির্দিষ্ট কিছু আমলে সব গুনাহ নিশ্চিতভাবে মাফ ও জান্নাত লাভ হয়।

সঠিক তথ্য: আশুরার রাতে নির্দিষ্ট তাসবিহ বা আমলের মাধ্যমে নিশ্চিত জান্নাত বা সব গুনাহ মাফের যে গ্যারান্টি কিছু বইয়ে দেওয়া হয়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। ইবাদতের ক্ষেত্রে শরীয়তের দলিলই একমাত্র গ্রহণযোগ্য।

৩. সামাজিক রীতিনীতি ও খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত কুসংস্কার

ভুল ধারণা: আশুরার দিনে বিশেষ গোসল, সুরমা, মেহেদি বা তেল ব্যবহারে রোগবালাই দূর হয়।

সঠিক তথ্য: এই দিনে গোসল করলে বা চোখে সুরমা দিলে সারা বছর চোখ ও শরীর রোগমুক্ত থাকে- এমন বিশ্বাসের সপক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই। এগুলোকে সুন্নাহ মনে করা ভুল।

ভুল ধারণা: এই দিনে খিচুড়ি বা বিশেষ খাবার রান্না করা সওয়াবের কাজ।

সঠিক তথ্য: আশুরার দিনে খিচুড়ি, হালুয়া-রুটি বা বিশেষ কোনো খাবার রান্না করাকে ধর্মীয়ভাবে ফজিলতপূর্ণ মনে করার কোনো দলিল নেই। সাধারণ খাবার হিসেবে যেকোনো কিছু রান্না করা বৈধ হলেও, একে আশুরার বিশেষ আমল বানানো অনুচিত।

৪. শোক প্রকাশ, উৎসব ও অমঙ্গলের ধারণা

ভুল ধারণা: মাতম, শরীর রক্তাক্ত করা ও বুক চাপড়ানো ইবাদতের অংশ।

সঠিক তথ্য: কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কিন্তু এর স্মরণে নিজের শরীরকে কষ্ট দেওয়া বা বিলাপ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

দলিল: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে (মৃত ব্যক্তির জন্য) গন্ডে চপেটাঘাত করে, জামার বক্ষ ছিন্ন করে এবং জাহিলি যুগের মতো চিৎকার দেয়।’ (সহিহ বুখারি: ১২৯৪)

ভুল ধারণা: আশুরা কেবলই চরম শোকের অথবা উল্লাসের দিন।

সঠিক তথ্য: একদল মানুষ একে শুধু শোকের দিন বানিয়ে ফেলেছে, অন্যদল আলোকসজ্জা ও আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আশুরা কোনোটিই নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, ইবাদত, তওবা ও শিক্ষা গ্রহণের দিন।

ভুল ধারণা: মহররম মাসে বিয়ে-শাদি করা অশুভ বা অমঙ্গলজনক।

সঠিক তথ্য: কারবালার শোকের কারণে অনেকে মনে করেন এই মাসে বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি আসে। অথচ ইসলামে কোনো মাস বা দিনকে অশুভ মনে করার সুযোগ নেই। মহররমে বিয়ে বা যেকোনো বৈধ কাজ করতে শরীয়তে কোনো বাধা নেই।

আশুরার প্রকৃত আমল ও শিক্ষা

আশুরার মূল শিক্ষা হলো সত্যের ওপর অবিচল থাকা, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা এবং কুসংস্কার বর্জন করে খাঁটি সুন্নাহর অনুসরণ করা। এ দিনের সবচেয়ে প্রমাণিত ও গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১/১১৬২)

তাই একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, যেকোনো আমল বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আবেগ তাড়িত না হয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাই করে নেওয়া। আল্লাহ আমাদের বিদআত ও কুসংস্কারমুক্ত সুন্নাহভিত্তিক জীবন গড়ার তাওফিক দিন। আমিন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Curaçao VS Ivory Coast
Scheduled
26 Jun, 02:00 AM
VS
World Cup