বুধবার
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি চাকরির নিয়োগবিধি পরিবর্তন, নতুন বৈষম্যের শঙ্কায় নাহিদ ইসলাম

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০২ পিএম
নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
expand

সরকারি চাকরির নতুন নিয়োগবিধিতে ভাইভার নম্বর কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ভাইভায় বেশি নম্বর রাখলে নিয়োগে নতুন করে বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

মঙ্গলবার (০৯ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এ সংক্রান্ত এক দীর্ঘ পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।

পোস্টে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর তরুণদের প্রত্যাশা ছিল সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ হবে। পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ বাড়বে এবং তদবির, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ যেন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা তৈরি হবে।’

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রস্তাবের খসড়া প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি অনুমোদন করেছে। গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখনো প্রস্তাবটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি।’

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১ ও ১২তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার কথা বলা হয়েছে। লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাসের নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ এবং লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৯০ থেকে কমিয়ে ৬০ করার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় পাসের নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ এবং লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৪০ থেকে কমিয়ে ২৫ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মূল প্রশ্ন ভাইভা থাকা উচিত কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, ভাইভায় এত বেশি নম্বর দেওয়ার যৌক্তিকতা কী।’

তিনি বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষার খাতা একজন প্রার্থীর উত্তর ও প্রাপ্ত নম্বরের দালিলিক প্রমাণ। নম্বর নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটি যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। কিন্তু ভাইভায় একজন প্রার্থী কেন ৪৫ পেলেন আর আরেকজন কেন ২৫ পেলেন, সেই পার্থক্য যাচাই করার সুযোগ নেই।’

তিনি প্রশ্ন করেন, একটি বোর্ড কোনো প্রার্থীকে ৪৫ নম্বর দিল, আরেকটি বোর্ড একই মানের পারফরম্যান্সে তাকে ২৫ দিল। তাহলে এই ২০ নম্বরের পার্থক্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?

নাহিদ ইসলামের মতে, ১০ নম্বরের ভাইভায় এ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ভাইভা ৪০ বা ৫০ নম্বরের হলে বোর্ডের মূল্যায়নই একজন প্রার্থীর চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরীক্ষার নিরাপত্তা নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অযোগ্য প্রার্থীরা পরীক্ষায় সুবিধা নিচ্ছেন। তাই ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে।

এই যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রক্সি পরীক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকছে কীভাবে? ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষার্থী হলে প্রবেশ করছে কীভাবে? পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি কেন?

তিনি আরও বলেন, ‘এসব সমস্যার সমাধান ভাইভার নম্বর বাড়ানো নয়, বরং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা। এ ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, ডিভাইস শনাক্তকরণ, প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব চাকরিপ্রার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না ’

ছয় দফা দাবি

নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছয়টি দাবি জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। এর মধ্যে রয়েছে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহার ও গেজেট প্রকাশের আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা, লিখিত পরীক্ষায় পাসের নম্বর কমানোর প্রস্তাব বাতিল এবং ভাইভার নম্বর যুক্তিসংগত সীমায় রাখা।

এ বিষয়ে শিক্ষক, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ, চাকরিপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

এ ছাড়া প্রক্সি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি ঠেকাতে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা সংস্কারের রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি করেছেন নাহিদ ইসলাম। ভাইভা বোর্ডে নির্দিষ্ট মূল্যায়ন ছক রাখা, প্রার্থীর নম্বর দেওয়ার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ এবং সম্ভব হলে ভাইভা ভিডিও রেকর্ডিংয়ের আওতায় আনার কথাও বলেছেন তিনি।

১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার জন্য আরও কেন্দ্রীভূত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরির দাবিও জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নিয়োগে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড ও অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সিভিল প্রশাসনে প্রায় ২০ লাখ পদের মধ্যে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদ প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। ফলে প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে সরকারি চাকরির বড় একটি অংশ নতুন নিয়োগ কাঠামোর আওতায় আসবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ-তরুণীরা এসব চাকরির জন্য মাসের পর মাস প্রস্তুতি নেন। অনেকেই আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান। তাঁদের জন্য একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষা নিজেদের ও পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের শুরু হয়েছিল চাকরিতে বৈষম্যমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। তাই নতুন করে বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে এমন কোনো ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত সরকারের নেওয়া উচিত নয়।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank