

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


‘পথের মানুষ আপন হয়েছে, আপন হয়েছে পর।’ একজন যাযাবরের পথচলার গল্প বলতে গিয়ে ভূপেন হাজারিকা যেন বলে গেছেন মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের কথা। পথ চলতে চলতে অচেনা মানুষ আপন হয়ে ওঠে; দূরের মানুষ হয়ে যায় কাছের। ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভৌগলিক দূরত্ব আর বাধা থাকে না। তখন মানুষের পরিচয় একটাই, ‘সে মানুষ’।
আজ ৮ সেপ্টেম্বর। কিংবদন্তি শিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার ভূপেন হাজারিকার জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে আসামের সদিয়ায় জন্মেছিলেন তিনি।
ভূপেন হাজারিকার গান শুনলে মনে হয়, তিনি মানুষের কাছে যেতেন। কখনো নদীর স্রোত ধরে, কখনো শহরের অলিগলি পেরিয়ে কিংবা এক দেশ থেকে আরেক দেশে। তার চোখে পৃথিবী ছিল বিশাল এক মানচিত্র। যার প্রতিটি বিন্দুতে ছিল মানুষের গল্প।
‘আমি এক যাযাবর’ শুনতে প্রথমে মনে হতে পারে এটি একজন পথিকের কথা। যে মানুষটি এক জায়গায় থেমে থাকেন না, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। তবে গানটির গভীরে ঢুকলে বোঝা যায়, এই যাযাবর কেবল ভ্রমণকারী নন। তিনি একজন ‘বিশ্বমানব’।
গানের কথায় একের পর এক উঠে আসে পৃথিবীর নানা ভূখণ্ড, নদী, শহর ও সভ্যতার চিত্র। গঙ্গা থেকে মিসিসিপি, ভলগা থেকে ইউরোপের নগরসভ্যতা। আর এখানেই ভৌগোলিক দূরত্ব যেন অর্থহীন হয়ে যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা এসে মিশে যায় এক মানবিক অনুভূতিতে।
ভূপেন হাজারিকার যাযাবর চরিত্রটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তার কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঠিকানা না থাকলেও তার আপনজনের অভাব নেই। পথেই সে আপনজন খুঁজে পায়। এই জায়গাটিই পঙ্ক্তিটিকে গভীর করে তোলে,‘পথের মানুষ আপন হয়েছে, আপন হয়েছে পর’।
পথে দেখা মানুষটি হয়তো কিছুক্ষণের জন্যই পাশে থাকে। কিন্তু সেই সামান্য পরিচয়ও হৃদয়ে দাগ রেখে যায়। কোনো ভাষা না মিললেও অনুভূতি মিলে যায়। কোনো সংস্কৃতি; ধর্ম-বর্ণ এক না হলেও মানবিকতা এক হয়ে যায়।
ভূপেন হাজারিকার মানবতাবাদ শুধু সুন্দর কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার গানে বারবার উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবণ, দারিদ্র, বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা।
একজন শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট যেমন তাকে নাড়া দিয়েছে, তেমনি পৃথিবীর অন্য প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের বেদনাও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ দুঃখের কোনো দেশ নেই; একজন মায়ের কিংবা বোনের কান্না বুঝতে অন্য ভাষা জানতে হয় না। একই ধর্মের হতে হয় না। ভূপেন হাজারিকার গান এই সহজ সত্যকেই বারবার সামনে নিয়ে এসেছে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে একে অপরের কাছে এসেছে, কিন্তু মানসিক দূরত্ব অনেক সময় থেকেই গেছে। পরিচয়ের নামে বিভাজন, ভাষার নামে দূরত্ব, ভূখন্ড কিংবা বলতে গেলে ধর্মের নামে মানুষের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে।
তাই এমন সময়ে ভূপেন হাজারিকার সেই যাযাবর আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। তিনি শেখান, অচেনাকে ভয় না পেয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে। অন্যের সংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে না দিয়ে তাকে জানার চেষ্টা করতে। নিজের পরিচয়কে ভালোবেসেও অন্যের পরিচয়কে সম্মান করতে।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মনে করিয়ে দেন ‘পর’ বলে যাকে দূরে সরিয়ে রাখছি, সেও কোনো একদিন ‘আপন’ হয়ে উঠতে পারে। আর এজন্য শুধু দরকার একটু কাছে যাওয়া, একটু বোঝার চেষ্টা করা।


