

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


একটি নিজের ঘর, একটু নিরাপদ ঠিকানা আর সন্তানদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ—এই স্বপ্ন নিয়েই তিন দশক কেটে গেছে ধামরাইয়ের রূপনগর বেদে পল্লীর বহু পরিবারের। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কখনো নৌকায়, কখনো অন্যের জায়গায় বসতি গড়ে দিন কাটিয়েছেন তারা। এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের পথে। স্থায়ী আবাসনের জন্য খাসজমি, পরিবারের নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন এবং পল্লীর উন্নয়নে ৫ লাখ টাকার সহায়তা পেয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব সহায়তা হস্তান্তর করেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ ফরিদা খানম।
ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের রূপনগর এলাকায় প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। দীর্ঘ এই সময়ে অধিকাংশ পরিবারেরই হয়নি নিজস্ব জমি বা স্থায়ী আবাসন। জীবিকার প্রয়োজনে একসময় নৌকাই ছিল তাদের ঘর। পরে স্থলভাগে বসতি গড়লেও তা ছিল অন্যের জায়গায়। ফলে ঘর থাকলেও ছিল না নিশ্চিন্তে বসবাসের নিশ্চয়তা।
দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতায় পরিবর্তনের আশায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পল্লীর বাসিন্দাদের স্থায়ী আবাসনের জন্য খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে স্বাবলম্বী করে তুলতে ২৫ জন নারীকে দেওয়া হয়েছে সেলাই মেশিন।
জেলা প্রশাসনের ‘হ্যালো ডিসি’ কার্যক্রমের মাধ্যমে সেলাই মেশিনের জন্য আবেদন করেছিলেন রূপনগর বেদে পল্লীর এসব নারী। আবেদনে সাড়া দিয়ে তাদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু নারীদের হাতে কর্মের সুযোগই তৈরি হচ্ছে না, বাড়ছে পরিবারগুলোর আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও।
পল্লীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে উপজেলা পরিষদের বিশেষ তহবিল থেকে আরও ৫ লাখ টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের চেক দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রাখা যাবে না। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষও এই সমাজেরই অংশ। তাদের স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে আমরা কাজ করছি।’
তিনি বলেন, ‘মানুষকে শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, এমন সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন বদলাতে পারেন। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেদে পল্লীর নারীরা স্বাবলম্বী হবেন এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে শক্তিশালী হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
গত ২০ আগস্ট রূপনগর বেদে পল্লী সরেজমিনে পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম। প্রায় ৩০ বছর পর কোনো জেলা প্রশাসকের ওই পল্লীতে প্রথম সরেজমিন পরিদর্শন ছিল এটি। এ সময় তিনি বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অভাব, সন্তানদের শিক্ষা ও জীবনযাপনের নানা সমস্যার কথা শোনেন।
পরিদর্শনের সময় পল্লীর বাসিন্দাদের স্থায়ী আবাসন, আত্মকর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসক। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন শুরু হলো খাসজমি বরাদ্দ, ২৫ নারীর হাতে সেলাই মেশিন এবং পল্লীর উন্নয়নে ৫ লাখ টাকার বরাদ্দের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর তাই রূপনগর বেদে পল্লীর পরিবারগুলোর স্বপ্ন এখন কেবল একটি ঘর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিজেদের একটি স্থায়ী ঠিকানা, পরিবারের নারীদের হাতে কাজ এবং সন্তানদের জন্য একটু ভালো ভবিষ্যৎ—এই তিন প্রত্যাশা ঘিরেই নতুন করে পথচলার স্বপ্ন দেখছেন তারা।


