

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


অন্ধকারের মায়াবী আলো জোনাকি পোকা আজ বিশ্বজুড়ে এক চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের তৈরি নানা পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণেই প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এই অনন্য পতঙ্গ।
জোনাকি পোকা, যার বৈজ্ঞানিক নাম: Lampyridae শুধু রাতের অন্ধকারের সৌন্দর্যই নয়, বরং এরা আমাদের বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও নগর অঞ্চলগুলোতে জোনাকির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এবং বিভিন্ন কীটতত্ত্ববিদদের গবেষণা অনুযায়ী, জোনাকিরা এখন বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
জোনাকি পোকা হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণসমূহ
গবেষণায় জোনাকি পোকা কমে যাওয়ার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান এবং কয়েকটি আনুষঙ্গিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
ক) বাসস্থান ধ্বংস ও নগরায়ণ
জোনাকিদের জীবনচক্রের একটা বড় সময় কাটে লার্ভা বা শূককীট অবস্থায়। এরা সাধারণত আর্দ্র পরিবেশ যেমন- জলাভূমি, পুকুরপাড়, বনাঞ্চল, ঘন ঝোপঝাড় এবং গাছের নিচের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বাস করে।
দ্রুত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে জোনাকির প্রাকৃতিক বাসস্থান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নদীর পাড় বা বনের প্রান্তীয় অঞ্চল কেটে ফেলার কারণে এরা বংশবৃদ্ধির জায়গা হারাচ্ছে।
খ) আলোক দূষণ
জোনাকির হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কৃত্রিম আলোকে অন্যতম প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জোনাকিরা তাদের শরীরের বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় (Luciferin ও Luciferase-এর বিক্রিয়ায়) আলো জ্বেলে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করে।
পুরুষ জোনাকি আলো জ্বালিয়ে সংকেত দেয় এবং স্ত্রী জোনাকি তা দেখে সাড়া দেয়, যা তাদের প্রজননের মূল মাধ্যম।
রাতের বেলা অতিরিক্ত স্ট্রিট লাইট, এলইডি (LED) বাল্ব, গাড়ি এবং বহুতল ভবনের তীব্র কৃত্রিম আলোর কারণে জোনাকির নিজস্ব মৃদু আলো ঢাকা পড়ে যায়।
ফলে পুরুষ ও স্ত্রী জোনাকি একে অপরকে খুঁজে পায় না, যা তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যাহত করছে।
গ) কীটনাশক ও রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
আধুনিক কৃষিকাজে এবং মশা নিধনে ব্যবহৃত তীব্র রাসায়নিক কীটনাশক জোনাকি ধ্বংসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। জোনাকির লার্ভা মাটিতে থাকে এবং তারা ছোট ছোট শামুক বা পোকা খেয়ে বেঁচে থাকে।
জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এই লার্ভাগুলো মারা যায় এবং তাদের খাদ্যসংকট তৈরি হয়।
ঘ) জলবায়ু পরিবর্তন
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং অসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা খরার কারণে মাটির আর্দ্রতা নষ্ট হচ্ছে। জোনাকির ডিম ও লার্ভা বেঁচে থাকার জন্য যে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রয়োজন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব
জোনাকি কমে যাওয়া মানে কেবল একটি সুন্দর পতঙ্গ হারিয়ে যাওয়া নয়, এটি পরিবেশ বিপর্যয়ের একটি বড় সংকেত।
বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট: জোনাকির লার্ভা ক্ষতিকারক শামুক ও পোকা খেয়ে ফসলের সুরক্ষা দেয়। জোনাকি কমে গেলে এসব ক্ষতিকর জীবের উপদ্রব বাড়ে।
খাদ্য শৃঙ্খলে ব্যাঘাত: ব্যাঙ, টিকটিকি, মাকড়সা এবং কিছু পাখির অন্যতম প্রধান খাদ্য জোনাকি। ফলে জোনাকি কমে গেলে খাদ্য শৃঙ্খলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উত্তরণ ও সংরক্ষণের উপায়
প্রকৃতির এই জীবন্ত আলোকদের ফিরিয়ে আনতে এবং টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. কৃত্রিম আলো নিয়ন্ত্রণ: জোনাকিপ্রবণ এলাকায় রাতের বেলা অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা এবং কম ক্ষতিকর (যেমন- লাল বা মৃদু হলুদ আলো) ব্যবহার করা।
২. প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা: পুকুরপাড়, নদীর তীর এবং ঝোপঝাড় সম্পূর্ণ পরিষ্কার না করে কিছু অংশ প্রাকৃতিকভাবে জঙ্গল ও আর্দ্র রাখতে হবে।
৩. জৈব চাষাবাদ: কৃষিতে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব বা পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক ব্যবহার করা।
জোনাকি পোকার হারিয়ে যাওয়া মূলত মানুষের তৈরি পরিবেশ দূষণেরই এক নীরব প্রতিফলন। এই আলোক পতঙ্গকে বাঁচাতে হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রকৃতিবান্ধব জীবনযাত্রার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
অন্যথায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জোনাকি কেবলই রূপকথার গল্প হয়ে থাকবে।
