রবিবার
১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৯ জুলাই ২০২৬, ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঠিকাদার-যুবদল ও এলজিইডির যোগসাজশে খাল পুনঃখননে ‘সাগর চুরি’

সালমান ইমন, কমলনগর-রামগতি (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খাল পুনর্খননের পরবর্তী চিত্র। ছবি: এনপিবি
expand
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খাল পুনর্খননের পরবর্তী চিত্র। ছবি: এনপিবি

* ২৩ লাখ টাকায় প্রকল্প হস্তান্তর, ১০ লাখ টাকায় কাজ সম্পন্নের অভিযোগ

* কাগজে কোটি টাকার খনন, মাঠে মিলছে না কাজের ছাপ

* শ্রমিক ছাড়াই ভেকু দিয়ে খনন, মানা হয়নি কার্যাদেশের শর্ত

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদার, স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতা এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকার প্রকল্পটি প্রাক্কলন অনুযায়ী বাস্তবায়ন না করে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ২৩ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। পরে মাত্র ১০ লাখ টাকায় এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় এলাকাবাসীর ভাষায়, ‘এটি শুধু পুকুর চুরি নয়, যেন সাগর চুরি।’

প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় রাস্তাসহ ধসে পড়েছে। ছবি: এনপিবি

উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর আওতায় কমলনগর উপজেলার জারিরদোনা শাখা খালের হাজিরহাট মেঘনা সিনেমা হল এলাকা থেকে দক্ষিণ দিকে ৫ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়।

দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্স ১ কোটি ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা মূল্যে কার্যাদেশ পায়। কার্যাদেশ অনুযায়ী খালের ওপরের প্রস্থ ১৫ মিটার, নিচের প্রস্থ ২.৫ মিটার এবং নির্ধারিত গভীরতা পর্যন্ত খননের পাশাপাশি ১৩টি রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএম নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে।

প্রাক্কলন অনুযায়ী হয়নি কাজ

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কোথাও খালের গভীরতা কিংবা প্রশস্ততা নিশ্চিত করা হয়নি। অনেক স্থানে খালের পরিবর্তে নালার মতো সীমিত পরিসরে মাটি কেটে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এছাড়া কার্যাদেশে উল্লেখিত ১৩টি রেফারেন্স বেড ব্লক ও ২৬টি টিবিএমের কোনো অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ভেকু দিয়ে খাড়া করে করে মাটি কাটায় ধসে পড়েছে পাড়। ছবি: এনপিবি

অর্থ না দিলে ক্ষতি করার অভিযোগ

৫নং চর ফলকন ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরজাহান অভিযোগ করেন, খাল খননের সময় ভেকু চালক তার কাছে ৬ হাজার টাকা দাবি করেন। শর্ত ছিল, টাকা দিলে খালের পাড়ে মাটি দেওয়া হবে এবং বাড়িতে যাতায়াতের জন্য নির্মিত সেতু ভাঙা হবে না।

তিনি বলেন, ঘরে কোনো টাকা ছিল না।নিরুপায় ও ভয়ে প্রতিবেশী থেকে ৪ হাজার টাকা ধার করে ভেকু চালককে দিতে হয়েছে।

একই এলাকার সুরাইয়া বেগম অভিযোগ করেন, তার বাড়িতে যাতায়াতের সেতু রক্ষা করতে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তিনি টাকা না দেওয়ায় তার খালের পাড়ে মাটি খাড়া করে কেটে অন্য পাশে ফেলে রাখা হয়, ফলে তার জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হাজিরহাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. হানিফ (৭০) এনপিবি নিউজকে বলেন, নিষেধ করা সত্ত্বেও ভেকু দিয়ে তার প্রায় দেড় লাখ টাকার গাছপালা ও স্থাপনা নষ্ট করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘১৫টি নারিকেল গাছ, ৩০টি সুপারি গাছ, দুটি বাঁশঝাড়, ২০টি মেহগনি গাছ, দুটি টয়লেটসহ অসংখ্য গাছ ভেঙে ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এগুলোই ছিল আমার একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন। আমি গরিব মানুষ, আমার এই ক্ষতির বিচার করার কেউ নেই।’

খালের আশপাশের আরও অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, গাছ রক্ষা করা, খালের পাড়ে মাটি ফেলা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতি এড়ানোর জন্য ভেকু চালক বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে টাকা দাবি করেন। যারা টাকা দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হয়েছে। আর যারা টাকা দিতে রাজি হননি, তাদের জমি, খালের পাড় ও গাছপালার ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

২৩ লাখে বিক্রি, ১০ লাখে কাজ শেষ

স্থানীয়দের দাবি, মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্সের কাছ থেকে স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতা ২৩ লাখ টাকায় প্রকল্পটি কিনে নেন। পরে তারা ভেকু মালিকের সঙ্গে মাত্র ১০ লাখ টাকায় কাজের চুক্তি করেন।

তাদের অভিযোগ, কার্যাদেশ অনুযায়ী মোট কাজের অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রমিক দিয়ে সম্পন্ন করার শর্ত থাকলেও কোনো শ্রমিক ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া খালের দুই পাড়ের দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণ না করে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মাঝখান দিয়ে সীমিত পরিসরে খনন করে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রস্থ বজায় না রাখায় দুই পাড়ে পর্যাপ্ত মাটি ফেলা সম্ভব হয়নি। এতে বিভিন্ন স্থানে গাইডওয়াল ধসে পড়ছে এবং পাড়সংলগ্ন সড়ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘এটি একটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প। কিন্তু দায়সারাভাবে কাজ করে প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এটি যেন সাগর চুরি। পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।’

পাঠওয়ারীরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য শঙ্কর মজুমদার বলেন, ‘এ প্রকল্প থেকে এলাকাবাসীর সুফল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজের অনিয়মের কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।’

স্থানীয়রা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ও ফলকন ইউনিয়নে অবস্থিত এই সেতু রক্ষা করতে ভেকু চালককে দিতে হয়েছিল ৪ হাজার টাকা। ছবি: এনপিবি

যা বলছেন অভিযুক্তরা

হাজিরহাট ইউনিয়ন যুবদল নেতা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, নীলিমা ট্রেডার্সের কাছ থেকে আমরা কয়েকজন মিলে কাজটি নিয়েছি। কার্যাদেশ অনুযায়ীই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নীলিমা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও রামগতি পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি অপরূপ দাস বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এলজিইডির প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলুন।

প্রকল্পটির তদারকি কর্মকর্তা, এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী ছিদ্দিকী বলেন, প্রকল্পে শ্রমিক ব্যবহার করা হয়নি, ভেকু মেশিন দিয়ে হলেও তো কাজ করা হয়েছে। আমি দুই দিন পরিদর্শনে গিয়েছি, তখন অন্যান্য বিষয় ঠিকই পেয়েছি।

ইতোমধ্যে ঠিকাদার বিল উত্তোলন করেছেন। তবে কার্যাদেশে উল্লেখিত রেফারেন্স বেড ব্লক ও টিবিএম নির্মাণের অস্তিত্ব না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ বলেন, অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে রয়েছেন। পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Spain VS Argentina
Scheduled
20 Jul, 01:00 AM
VS
World Cup