


এক টার্মিনালে নতুন এলএনজি কার্গো এসে গ্যাসের প্রবাহ বাড়িয়েছে, অন্য টার্মিনালে মজুত ফুরিয়ে আসায় কমেছে সরবরাহ। ফলে দুই দিকের এই টানাপোড়েনে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ সামান্য বাড়লেও সংকট কাটার মতো স্বস্তি ফেরেনি। বরং এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপও কমছে না।
মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন কার্গো আসার পর শনিবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। গত বুধবার নতুন কার্গো না থাকায় এই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে শনিবার থেকে ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়াতে থাকে এক্সিলারেট।
অন্যদিকে, গত ১৫ আগস্ট থেকে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলা সামিটের টার্মিনালে এলএনজির মজুত কমে আসায় সেখান থেকে সরবরাহ কমানো হয়েছে। ফলে এক্সিলারেট থেকে বাড়তি গ্যাস এলেও সামিটের সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ খুব বেশি বাড়েনি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক ২২০ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। তখন এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে কোনো গ্যাস সরবরাহ হচ্ছিল না। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসছিল ১৬২ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনাল থেকে ৫৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট।
রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে দুটি টার্মিনালই চালু থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট এবং দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৭৫ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছিল।
রোববার রাত আটটার দিকে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এলএনজির মধ্যে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনাল থেকে বাকি ২৫ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।
অর্থাৎ শনিবার যেখানে সামিট একাই ৫৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছিল, রোববার এক্সিলারেটের সরবরাহ শুরু হওয়ার পর সামিটের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে দুটি টার্মিনাল মিলে সরবরাহ বেড়েছে ঠিকই, তবে জাতীয় গ্রিডে সেই অনুপাতে বাড়তি গ্যাস যোগ হয়নি।
পেট্রোবাংলার তদারকিতে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের কাজ করে আরপিজিসিএল। সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, সামিটের টার্মিনালে মজুত কমে আসায় সেখান থেকে সরবরাহ কমানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একটি কার্গো থেকে পাওয়া এলএনজি দিয়ে টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালালে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন সরবরাহ দেওয়া যায়। গত ১৫ আগস্ট থেকে সামিটের টার্মিনাল প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করছে। ফলে এর মজুত কমে এসেছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, আগামী ২৫ বা ২৬ আগস্ট সামিটের টার্মিনালের জন্য নতুন একটি এলএনজি কার্গো আসতে পারে।
এলএনজির নতুন কার্গো না থাকায় গত বুধবার বিকেলে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন কার্গো আসার পর শনিবার দুপুর দুইটা থেকে টার্মিনালে থাকা এলএনজি দিয়ে আবার সরবরাহ শুরু হয়।
এরপর ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ায় এক্সিলারেট এনার্জি। রোববার সন্ধ্যায় এই টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছিল। তবে এক্সিলারেটের সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও সামিটের মজুত কমে আসায় সেখানকার সরবরাহ কমানো হয়েছে। ফলে দুটি টার্মিনালের সরবরাহ মিলিয়ে পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, চলতি আগস্টে দেশে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে চারটি কার্গো আনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এর একটি কার্গোও সময়মতো না আসায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে সেপ্টেম্বরের জন্য স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে আরও তিন কার্গো এলএনজি আমদানির দরপত্র আহ্বান করেছে আরপিজিসিএল।
দরপত্রের সূচি অনুযায়ী, প্রথম কার্গোটি ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর, দ্বিতীয়টি ২৩-২৪ সেপ্টেম্বর এবং তৃতীয়টি ২৪-২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করতে হবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার কারণে কাতার এনার্জি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে অপারগতার কথা জানিয়েছে। এ কারণে এখন স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আশা করছি, স্পট মার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গোর ব্যবস্থা করা যাবে। তবে দুই টার্মিনালের জন্য পরবর্তী কার্গো কবে নাগাদ আসবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি মো. শোয়েব। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হয়। স্বাভাবিক সময়ে এর মধ্যে এলএনজি থেকে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাকি অংশ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে সক্ষমতার অর্ধেকের মতো। এতে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের ঘাটতি আরও বেড়েছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
২০১৮ সাল থেকে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা এলএনজি কক্সবাজারের মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এই দুটি টার্মিনাল।
দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও আমদানিনির্ভর এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশীয় গ্যাসের সরবরাহও যেকোনো সময় আরও কমে যেতে পারে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
তিনি বলেন, আমাদের পুরো অর্থনীতি গ্যাসভিত্তিক। তাই গ্যাসের সংস্থান করতেই হবে। এই মুহূর্তে সেটা নিজস্ব উৎস থেকে হোক বা আমদানি করে।
সরকার অবশ্য নতুন করে শতাধিক কূপ খননের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক উন্মুক্ত করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের ফল পেতে সময় লাগবে। আপাতত তাই দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির বড় অংশই নির্ভর করছে সময়মতো এলএনজি কার্গো আসা এবং মহেশখালীর দুই টার্মিনালের মজুত ধরে রাখার ওপর।