সোমবার
২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৭ এএম
শরিফ ওসমান হাদি
expand
শরিফ ওসমান হাদি

ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে হত্যার পরিকল্পনা, নজরদারি, হামলা, পালানোর প্রস্তুতি ও ভারতে আত্মগোপনের বিষয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হামলার আগে কয়েক দিন ধরে হাদির চলাচল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। হত্যার পর প্রধান শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাদের গ্রেপ্তার করে।

তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্যও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। অনুসারী, ভোটার কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর ছদ্মবেশে তারা হাদির কাছাকাছি অবস্থান করে তার নিয়মিত চলাচল, গন্তব্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে ৭-৮ জনের একটি বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতির তথ্যও তদন্তকারীরা পেয়েছেন। এটিকে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

হামলার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে প্রবেশ করেন। এর তিন মিনিট পর মোটরসাইকেলে করে ফয়সাল ও আলমগীর মসজিদের কাছে খলিল হোটেল গলিতে অবস্থান নেন।

প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা তারা ওই এলাকা ও আশপাশে অবস্থান করে হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। নামাজ শেষে হাদি বের হয়ে অটোরিকশায় উঠলে তারা মোটরসাইকেলে করে তাকে অনুসরণ করতে থাকেন।

দুপুর আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে হাদিকে গুলি করেন। এরপর তারা বিজয়নগরের পানির ট্যাংকি মোড় হয়ে পল্টনের দিকে পালিয়ে যান।

গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

কারা ছিলেন হামলায়?

প্রাথমিক তদন্তে প্রায় সব তদন্ত সংস্থাই ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ফয়সাল ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলমগীরও আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তদন্তকারীরা বিভিন্ন মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, সিডিআর, আইএমইআই, সিসিটিভি ফুটেজ ও সন্দেহভাজনদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে হামলার সঙ্গে আরও কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন।

অস্ত্র সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়, পালানোর প্রস্তুতি ও হামলার আগের রাতে কয়েকটি এলাকায় সন্দেহজনক চলাচলের তথ্যও তদন্তে এসেছে।

হামলার আগের রাতেও ছিল তৎপরতা

তদন্ত অনুযায়ী, হামলার আগের দিন ১১ ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরের বাসায় গিয়ে স্ত্রী, মা ও দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন। হামলার আগে ও পরে একাধিক মোবাইল নম্বর ও হ্যান্ডসেট ব্যবহার করা হয়। কিছু নম্বর অল্প সময়ের জন্য সক্রিয় ছিল এবং কিছু নম্বর অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত ছিল। একই আইএমইআই নম্বরে একাধিক সিম ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

ঘটনার আগের রাতে তানজিমুল ও আলী নামে দুই ব্যক্তি পৃথকভাবে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে যান বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাদের ঢাকায় ফেরার তথ্য পাওয়া যায়। তানজিমুলের উত্তরা বা বিমানবন্দর এলাকায় আব্দুল্লাহ মামুনের সঙ্গে দেখা করার পর আগারগাঁও-মোহাম্মদপুর এলাকায় ফয়সাল ও আলীর সঙ্গে থাকার তথ্যও তদন্তে এসেছে।

তাদের কয়েকজনকে পরে র‍্যাব গ্রেপ্তার করে। অস্ত্র সরবরাহ কিংবা হামলার প্রস্তুতিতে তাদের ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হয়।

ঘটনার দিন ভোরে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের গ্রিন জোন কটেজে দুই সন্দেহভাজন যুবকের প্রবেশের তথ্যও পাওয়া যায়। কটেজের সার্ভিসবয় সিয়ামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ফয়সাল ও আলমগীর সেখানে অবস্থান করেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।

হামলার পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে

তদন্তকারীদের মতে, হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীরের পালানোর পথও আগে থেকে প্রস্তুত করা হয়েছিল।

দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় তারা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমাসহ স্থানীয় কয়েকজন চোরাকারবারি তাদের সীমান্ত পারাপার ও ভারতে অবস্থানে সহায়তা করেছিলেন বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে।

তাদের বিরুদ্ধে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন ও বেআইনিভাবে অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ওই জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, অর্থদাতা এবং ভারতে সহযোগিতাকারীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাপ্পী ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অবস্থান করছেন।

তদন্তে দাবি করা হয়েছে, ভারতে তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী নামে আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহ করেছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখের দিন ও মাস অপরিবর্তিত রেখে জন্মসাল পরিবর্তন এবং বাবার নাম আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, পরে অধিকতর তদন্ত

হাদি হত্যার ২১ দিনের মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ ওই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হয়নি। তাদের অভিযোগ, ডিবির তদন্তে হামলায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করা হয়েছে।

এরপর তারা আদালতে নারাজি আবেদন করেন। পরে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

বর্তমানে সিআইডি হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, অর্থের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ, ডিজিটাল যোগাযোগ, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, সীমান্ত পারাপার এবং ভারতে পালানোর পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে।

তদন্তে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পাশাপাশি ১২০(বি) ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।

প্রত্যর্পণে কেন দেরি?

ফয়সাল ও আলমগীরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা থাকায় সরাসরি প্রত্যর্পণ করা যাচ্ছে না বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতে চলমান মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, বাংলাদেশের পাঠানো নথির গ্রহণযোগ্যতা এবং দুই দেশের আইনে অপরাধের সামঞ্জস্য-এসব বিষয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় ভারতে মানবাধিকার ও সম্ভাব্য সাজা নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ফলে আসামিদের ফেরাতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ, দ্রুত নথি আদান-প্রদান এবং আদালতকেন্দ্রিক আইনি সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

১৮ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন

ভারত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সীমান্ত পারাপার ও সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পেতে দেরি হওয়ায় সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত থাকলেও ওই তারিখে প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তেজনার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংগঠনটি আন্দোলনে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে বিরোধী দলগুলোও বিষয়টিকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: মানবজমিন

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন