মঙ্গলবার
২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেসির ভেজা চোখের খলনায়ক আর্জেন্টিনা 

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারকে ব্যাখ্যা করতে গেলে সময়ের ধারণাটাই যেন বদলে যায়। বল পায়ে তার গতি কখনো ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে মেলে না। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার যখন সিদ্ধান্ত নিতে ব্যস্ত, তখনই তিনি খুঁজে নেন অন্য পথ। ৩৯ বছর বয়সেও মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, সেই পুরোনো বার্সেলোনার মেসিই যেন আবার ফিরে এসেছেন—ড্রিবল, পাস কিংবা মুহূর্তের জাদুতে। তাই অনেকের কাছেই মনে হয়েছে, সময় তাকে হারিয়ে দেয়নি; বরং মেসিই নিজের শর্তে সময়ের সঙ্গে লড়ে গেছেন।

সদ্য সমাপ্ত টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা নিজেদের বারবার প্রমাণ করেছে। কঠিন মুহূর্ত থেকে ফিরে আসা, সঠিক সময়ে আঘাত হানা এবং বড় ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা এ সবই তারা দেখিয়েছে এই টুর্নামেন্টে। মেসিও ছিলেন সেই যাত্রার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু ফাইনালে যেন সেই পরিচিত দলটিকে খুঁজেই পাওয়া গেল না।

স্পেন শুরু থেকেই ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। বলের দখল, পাসের গতি এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা—সব দিকেই তারা ছিল এগিয়ে। আর্জেন্টিনা অপেক্ষা করেছে একটি মুহূর্তের জন্য, কিন্তু সেই মুহূর্ত আর আসেনি। নির্ধারিত সময়ে প্রতিপক্ষের গোলমুখে একটি শটও নিতে না পারা দলটির অসহায়ত্বই তুলে ধরেছে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে।

অতিরিক্ত সময়েও দৃশ্যপট বদলায়নি। স্পেন ধৈর্য ধরে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে, আর আর্জেন্টিনা ক্রমেই হারিয়েছে ম্যাচে ফেরার বিশ্বাস। শেষ পর্যন্ত যে গোলটি স্পেনকে শিরোপা এনে দেয়, সেটি যেন পুরো ম্যাচেরই স্বাভাবিক পরিণতি।

ফাইনালের আগে পর্যন্ত মেসি ছিলেন এই বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার। তার প্রতিটি স্পর্শে ছিল সৃজনশীলতার ছাপ, প্রতিটি সিদ্ধান্তে ছিল অভিজ্ঞতার ছায়া। কিন্তু ফাইনালে তাকে প্রায় অদৃশ্য করে রাখে স্পেনের রক্ষণ। বল পেলেও জায়গা পাননি, দৌড় শুরু করলেও সামনে ছিল একের পর এক প্রতিরোধ। এটি কেবল একজন খেলোয়াড়কে আটকে রাখার সাফল্য নয়, বরং পুরো ম্যাচ পরিকল্পনার নিখুঁত বাস্তবায়ন।

তবে একটি ম্যাচ দিয়ে মেসির ক্যারিয়ারকে বিচার করার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, আটটি ব্যালন ডি'অর—ফুটবলের প্রায় সব বড় অর্জনই তার ঝুলিতে। ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় সাফল্যের বিচারে তিনি অনেক আগেই নিজের অবস্থান ইতিহাসে স্থায়ী করে ফেলেছেন। তবু এই ফাইনাল জিততে পারলে তার গল্পে হয়তো আরেকটি অনন্য অধ্যায় যুক্ত হতো।

ফুটবলের সৌন্দর্যই হয়তো এখানে। সব কিংবদন্তির বিদায় রূপকথার মতো হয় না। কেউ ট্রফি হাতে বিদায় নেন, আবার কারও শেষ দৃশ্য হয়ে থাকে নীরব পরাজয়। মেসির ক্ষেত্রেও হয়তো সেটিই সত্যি হতে চলেছে।

অবশ্য এমন প্রশ্ন নতুন নয়। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর যখন তিনি জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখনও অনেকে ভেবেছিলেন, সেখানেই শেষ। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পরও শোনা গিয়েছিল বিদায়ের আলোচনা। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসে নতুন ইতিহাস লিখেছেন।

একসময় তাকে নিয়ে বলা হতো, বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নন। স্পেনে বেড়ে ওঠায় তার দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সময়ই সেই সব সমালোচনার জবাব দিয়েছে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ ও একাধিক কোপা আমেরিকা জিতে তিনি নিজের অবস্থান নিয়ে আর কোনো বিতর্কের সুযোগ রাখেননি।

ফাইনালের আগে লিওনেল স্কালোনি ও মেসি দুজনই বলেছিলেন, গত কয়েক বছরে দল যা অর্জন করেছে, সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কথাটি ভুল নয়। স্কালোনির অধীনেই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে, টানা দুটি কোপা আমেরিকা জিতেছে এবং হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। তিনি দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ হিসেবেই স্মরণীয় থাকবেন।

তবু এই ফাইনাল তার জন্যও প্রশ্ন রেখে গেল। কৌশল, ম্যাচ পরিকল্পনা এবং পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত; সবকিছু মিলিয়ে এটি স্কালোনির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল, যেখানে তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেননি।

সমর্থকদের কষ্টও সেখানেই। পরাজয় নয়, বরং যেভাবে পরাজয় এসেছে, সেটিই বেশি পোড়াচ্ছে। একটি দল, যারা পুরো টুর্নামেন্টে সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে, সেই দলই ফাইনালে নিজেদের ছায়ায় পরিণত হয়েছিল।

হয়তো কয়েক বছর পর এই ম্যাচটিও ইতিহাসের একটি পরিসংখ্যান হয়ে যাবে। কিন্তু নিউ জার্সির সেই রাত মনে থাকবে অন্য কারণে; এটি হয়তো এমন এক সন্ধ্যা, যখন ফুটবল ধীরে ধীরে বুঝে নিতে শুরু করল, লিওনেল মেসির যুগ সত্যিই শেষের দিকে। আর সব মহান গল্পের মতো, এই গল্পটিও শেষ হলো কিছু অপূর্ণতা, কিছু নীরবতা এবং অসংখ্য ‘যদি’ রেখে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬