শুক্রবার
২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশুরা কেন শিয়াদের কাছে শোকের প্রতীক? ‘হায় হুসেইন’ মাতম যেভাবে এলো

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
আশুরাতে শিয়াদের ভিন্নধর্মী উদ্‌যাপন
expand
আশুরাতে শিয়াদের ভিন্নধর্মী উদ্‌যাপন

১০ মহররম বা ‘আশুরা’ মুসলিম বিশ্বে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ঐতিহাসিকভাবে এই দিনটি প্রাক-ইসলামি আরব, হিব্রু বা আব্রাহামিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ইসলামের প্রাথমিক যুগে রোজা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন হিসেবে উদযাপিত হতো।

তবে ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম শাহাদাতের পর এই দিনের উদযাপনে এক বিশাল পরিবর্তন আসে।

কালক্রমে এই পরিবর্তন শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে এক অনন্য, আবেগঘন এবং বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানভিত্তিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে সাংস্কৃতিক রূপান্তর

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিয়া সম্প্রদায়ের বর্তমান আশুরা কেন্দ্রিক আচারগুলো এক দিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনের ফল।

ক) কারবালার ট্র্যাজেডি এবং অপরাধবোধ

৬১ হিজরির কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশের মনে গভীর ক্ষত ও অপরাধবোধের জন্ম দেয়। বিশেষ করে যারা ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের কারণে তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারেননি, তাদের মধ্যে এক তীব্র অনুশোচনা তৈরি হয়।

এই অনুশোচনা ও সমবেদনা থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘তাজিয়াদারি’ বা শোক প্রকাশের সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হয়।

খ) শোককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান (মজলিস ও নোহা)

উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে শিয়ারা তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে শুরু করে।

গোপনে ও পরবর্তীতে প্রকাশ্যে ‘ইমামবারা’ বা নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হয়ে কারবালার ঘটনা আলোচনা করার যে রীতি শুরু হয়, তা-ই আজকের 'মজলিস'

এই মজলিসগুলোতে আবেগ প্রকাশ করতে এবং কারবালার নিষ্ঠুরতা তুলে ধরতে যুক্ত হয় 'নোহা' (শোকগাথা) এবং 'মার্সিয়া' (বিলাপকবিতা) পাঠের সংস্কৃতি, যা মূলত পারস্য (ইরান) এবং আরব সংস্কৃতির কাব্যিক ঐতিহ্যের অংশ।

গ) দৃশ্যমান প্রতীকী আচার (তাজিয়া ও জুলজানাহ)

দশম শতাব্দীতে বুয়াইহিদ রাজবংশের আমলে এবং পরবর্তীতে সাফাভি আমলে ইরানে শিয়া ধর্ম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পর আশুরার আচারগুলো রাজকীয় ও সর্বজনীন রূপ নেয়।

তাজিয়া মিছিল:

ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মূল মাজার ইরাকের কারবালায় অবস্থিত হওয়ায় সবার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে দূর-দূরান্তের মানুষের আবেগ ধরে রাখতে ইমামের সমাধির একটি প্রতীকী প্রতিকৃতি বা 'তাজিয়া' তৈরি করে মিছিল করার সংস্কৃতি শুরু হয়।

জুলজানাহ ও যুদ্ধাস্ত্র:

কারবালার ময়দানে ইমামের বিশ্বস্ত অশ্ব 'জুলজানাহ'-এর বীরত্ব ও একাকীত্বকে স্মরণ করতে সাজানো ঘোড়া এবং যুদ্ধের আবহ তৈরিতে তরবারি, ঢাল ও বর্শা প্রদর্শনের রীতি যুক্ত হয়।

ঘ) ভারতীয় উপমহাদেশে সংস্কৃতির অভিযোজন

১৬শ শতাব্দীতে মোঘল আমলে এবং পরবর্তীতে শিয়া নবাবদের (যেমন ওয়াশেনী ডালান বা হোসেনী দালানের প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকার নবাবগণ) পৃষ্ঠপোষকতায় এই সংস্কৃতি ভারতীয় উপমহাদেশে এক নতুন মাত্রা পায়।

ঢাকার হোসেনী দালানকে কেন্দ্র করে খালি পায়ে কালো পোশাক পরে মাতম ও তাজিয়া মিছিলের যে সংস্কৃতি আমরা দেখি, তা পারসিয়ান সংস্কৃতির সাথে স্থানীয় বাঙালি সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে।

আশুরার শিয়া সংস্কৃতি-

তাজিয়া মিছিল:

ইমামের সমাধির প্রতীকী রূপ নিয়ে কালো পোশাক পরে খালি পায়ে শোকযাত্রা, যা শোকের সর্বজনীন প্রকাশ।

মজলিস ও মাতম:

কারবালার ইতিহাস শ্রবণ এবং বুক চাপড়ে (মাতম) সমবেদনা ও অনুশোচনা প্রকাশ।

নোহা ও মার্সিয়া

সমবেত কণ্ঠে বিলাপ কবিতা ও শোকসঙ্গীত পাঠ, যা পরিবেশকে আবেগঘন করে তোলে।

তবারক ও লঙ্গর

কারবালায় অবরুদ্ধ ইমামের পরিবার পানির তীব্র তৃষ্ণায় ভুগেছিলেন- এই স্মৃতি থেকে পথচারীদের মাঝে পানি, শরবত এবং সাধারণের মাঝে খিচুড়ি বা সিন্নি বিতরণ।

সমাজবিজ্ঞানী ড. আকবর এস. আহমেদ তাঁর ‘ইসলাম, গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড পোস্ট মডার্নিটি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এটি একটি প্রাচীন ধর্মীয় অনুশাসনের ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক রূপান্তরের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

ইসলামের মূল ধারায় যেখানে আশুরা ছিল তাওহিদ, আত্মশুদ্ধি এবং কৃতজ্ঞতার (রোজা) প্রতীক, সেখানে শিয়া সংস্কৃতিতে এটি হয়ে উঠেছে ত্যাগ, প্রতিরোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত প্রতীকী উৎসব।

বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে মূলত ইমাম হোসাইনের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখাই এই সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য।

পরিশেষে বলা যায়, শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে আশুরার এই ভিন্নধর্মী উদযাপনের কালচার মূলত কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পর তৈরি হওয়া গভীর আবেগ, রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের লড়াই এবং বিভিন্ন অঞ্চলের (বিশেষ করে পারস্য ও ভারতীয় উপমহাদেশ) সাংস্কৃতিক উপাদানের সমন্বয়ে বিবর্তিত হয়েছে।

এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বহু শতাব্দীর ইতিহাস, শিল্প, কবিতা এবং সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের এক জটিল ও বহুস্তরীয় স্মারক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Norway VS France
Scheduled
27 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup