

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইতিহাসের পাতা ওল্টালে কখনো কখনো এমন কিছু সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, যা আমাদের চেনা সামাজিক ও ধর্মীয় সমীকরণগুলোকে এক ঝটকায় বদলে দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশে এমনই এক পরম বিস্ময়ের নাম ‘হুসাইনি ব্রাহ্মণ’।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে দুটি বিপরীত মেরুর মিলন, কিন্তু বিশ্বাসের গভীরে তারা এক অনন্য সংস্কৃতির ধারক
ধর্মে তারা সনাতন হিন্দু, পূজা-পার্বণ করেন নিয়ম মেনেই, অথচ মহররমের ক্ষণে তারা শিয়া মুসলিমদের মতোই বুক ফাটানো কান্নায় ভেঙে পড়েন, তাজিয়া মিছিলে অংশ নেন এবং ইমাম হুসাইনের শোকে মাসজুড়ে সব রকম আনন্দ-উৎসব ও বিয়েশাদি থেকে বিরত থাকেন।
কারবালার প্রান্তে ভারতীয় যোদ্ধা
এই সম্প্রদায়ের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের কারবালার তপ্ত বালুচরে। তারা মূলত ‘মোহিয়াল’ ব্রাহ্মণদের দত্ত শাখার বংশধর। মোহিয়ালদের সাতটি প্রধান শাখার (বালি, চিব্বর, ভিমওয়াল, লাউ, মোহন, বেদ ও দত্ত) মধ্যে দত্তরাই নিজেদের হুসাইনি ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচয় দেন।
বিখ্যাত সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদের ১৯২৪ সালের ‘কারবালা’ নাটকে এই নির্ভীক যোদ্ধাদের কথা উঠে এসেছে।
তবে তাদের কারবালা যাত্রার ইতিহাস নিয়ে লোকশ্রুতির নানা রঙ রয়েছে। এক প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দত্ত ব্রাহ্মণদের নেতা রাহাব সিং দত্ত সপরিবারে বাগদাদের ‘দ্যায়র আল হিন্দিয়া’ (বর্তমান কারবালা প্রদেশের হিন্দিয়া শহর) নামক এলাকায় বাস করতেন। ইমাম হুসাইনের সাথে তার গভীর সখ্য ছিল।
ইমামের বিপদে সাড়া দিয়ে রাহাব সিং ও তার সেনারা কারবালার যুদ্ধে যোগ দেন এবং রাহাব তার সাত পুত্রকে এই ধর্মযুদ্ধে উৎসর্গ করেন।
জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের শিক্ষক ননিকা দত্ত (যিনি নিজেই এই বংশের সন্তান) এই বীরত্বের কথা সমর্থন করেন।
আবার অন্য একটি মতানুযায়ী, ইসলামি পণ্ডিত গুলাম রসুল দেহলভি জানান- স্বৈরাচারী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইনের আর্তনাদ যখন ভারতে পৌঁছায়, তখন ভারতের রাজা সমুদ্রগুপ্ত একদল সৈন্য পাঠান রাহাব সিং দত্তের নেতৃত্বে। কিন্তু তারা যখন কারবালায় পৌঁছান, ততক্ষণে ইমাম শহীদ হয়েছেন।
শোকে-ক্ষোভে এই বীর যোদ্ধারা নিজেদের তরবারি দিয়ে আত্মাহূতি দিতে চাইলে, আরবরা তাদের শান্ত করে এবং ইমামের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুখতার সাকাফির বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
গবেষক পিএন বালির মতে, এই সম্পর্কের সূত্রপাত আরও প্রাচীন। মহাভারতের অশ্বত্থামা নাকি পিতা দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর পর আরবে নির্বাসনে গিয়েছিলেন, আর তার বংশধরেরাই পরবর্তীতে ইমাম হুসাইনের অনুসারী হন।
আজকের দিনেও এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাদের পূর্বপুরুষদের সেই সর্বোচ্চ ত্যাগকে ভুলে যাননি। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্বপুরুষদের গলার ক্ষত বা ত্যাগের স্মৃতি স্মরণে তারা আজও প্রতীকীভাবে গলায় একটি দাগ বা চিহ্ন এঁকে রাখেন।
কালের নিয়মে আজ হুসাইনি ব্রাহ্মণরা ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে- ভারতের পুনে, দিল্লি, আজমির, অমৃতসর থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সিন্ধ, লাহোর এবং আফগানিস্তানের কান্দাহারে।
যদিও অনেকে এখন নিজেদের সাধারণ ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তবু একটি বড় অংশ আজও এই যৌথ ঐতিহ্যকে বুকে ধরে রেখেছেন।
বিখ্যাত কিছু মুখ
উপমহাদেশের বহু গুণী ব্যক্তিত্ব এই গৌরবান্বিত বংশের অংশ। বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা সুনিল দত্ত গর্বের সাথে নিজের হুসাইনি ব্রাহ্মণ পরিচয় দিতেন এবং লাহোরে তার পৈতৃক ভিটায় অনুদানও দিয়েছিলেন।
তার ছেলে সঞ্জয় দত্তও এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করেন। যোদ্ধা রক্তধারা বজায় রেখে এই সম্প্রদায়ের মেজর জেনারেল গগন দীপক বক্সি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সাথে অবদান রাখেন।
এছাড়া কাশ্মিরি লাল জাকির বা সুনিতা ঝিংরানের মতো বহু সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এই ঘরানার আলো ছড়িয়েছেন।
ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই কাহিনীর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, ইসলামি পণ্ডিতদের অনেকেই হয়তো আরবি নথিতে এর প্রমাণ খোঁজেন, কিন্তু হুসাইনি ব্রাহ্মণদের কাছে কারবালার ত্যাগ কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের অংশ।
বর্তমানের তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের যুগে দাঁড়িয়ে, হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির এই অভূতপূর্ব মেলবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানবতা ও ন্যায়ের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
