

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সামান্য মাথা ব্যথা, দাঁত ব্যথা, পিঠ বা জয়েন্টের ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ব্যথানাশক (Painkiller) ওষুধ কিনে খাওয়া আমাদের দেশে অত্যন্ত সাধারণ একটি অভ্যাস।
এই ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার সাময়িক আরামদায়ক অভ্যাসটি যে শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ- কিডনিকে নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যথানাশকের অপব্যবহারের কারণে কিডনি বিকল হওয়াকে 'অ্যানালজেসিক নেফ্রোপ্যাথি' (Analgesic Nephropathy) বলা হয়।
কীভাবে ব্যথানাশক ওষুধ কিডনির ক্ষতি করে?
আমাদের কিডনি প্রতিদিন শরীরের রক্ত ফিল্টার বা ছাঁকন করে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়। এই জটিল কাজের জন্য কিডনিতে প্রচুর পরিমাণ রক্ত প্রবাহের প্রয়োজন হয়।
আমরা যখন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন বা উচ্চ মাত্রায় সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ, বিশেষ করে NSAIDs (Non-Steroidal Anti-Inflammatory Drugs) খাই তখন তা কিডনির স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালনে বাধা দেয়।
রক্ত প্রবাহ হ্রাস: ব্যথানাশক ওষুধগুলো শরীরে প্রস্টাগ্ল্যান্ডিন (Prostaglandin) নামক রাসায়নিকের উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কিডনির রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত রেখে রক্ত সরবরাহ সচল রাখতে সাহায্য করে।
ছাঁকনি নষ্ট হওয়া: রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়ায় কিডনির কার্যকারী একক বা ছাঁকনিগুলো (নেফ্রন) প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না। ফলে এগুলো ধীরে ধীরে অকেজো হতে শুরু করে।
স্থায়ী ক্ষতি: দীর্ঘদিন ধরে এই অবহেলা চলতে থাকলে কিডনি স্থায়ীভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং তার কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে।
'নীরব ঘাতক' কেন বলা হয়?
কিডনি অত্যন্ত সহনশীল একটি অঙ্গ। সাধারণত কিডনির কার্যক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নষ্ট হওয়ার আগে শরীরে বাইরে থেকে কোনো বড় উপসর্গ বা সংকেত দেখা যায় না।
যখন লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়, ততক্ষণে কিডনি প্রায় শেষ পর্যায়ে (Chronic Kidney Disease) চলে যায়। এই নীরব ধ্বংসযজ্ঞের কারণে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে তাদের অজান্তেই প্রতিদিনের একটি ছোট অভ্যাস তাদের কতটা বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
কিডনি ক্ষতির প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
যখন ব্যথানাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শরীরে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
হাত, পা, মুখ বা চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া (শরীরে জল জমে যাওয়া)।
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, রঙ পরিবর্তন হওয়া বা প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া।
সব সময় তীব্র ক্লান্তি, অলসতা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করা।
হঠাৎ করে রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যাওয়া।
বমি বমি ভাব, বমি হওয়া এবং খাবারে তীব্র অরুচি।
আমাদের করণীয় ও সচেতনতা
সামান্য ব্যথায় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস আজই বর্জন করতে হবে। কিডনি সুরক্ষিত রাখতে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি:
১. ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া: যেকোনো ধরনের শারীরিক ব্যথায় নিজে নিজে ওষুধ না কিনে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. বিকল্প উপায় খোঁজা: হালকা ব্যথায় ওষুধের ওপর নির্ভর না করে কুসুম গরম জলের সেঁক, পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা প্রাকৃতিক উপায়ে উপশমের চেষ্টা করুন।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনিক পর্যাপ্ত পরিমাণ জল পান করুন, যা কিডনি থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে।
৪. বিশেষ সতর্কতা: যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সামান্য সমস্যা রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের কঠোর নজরদারি ছাড়া কোনো ব্যথানাশক ওষুধ স্পর্শও করা উচিত নয়।
সাময়িক একটু আরামের জন্য নিজের অজান্তে নিজের জীবনকে চিরতরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবেন না। সচেতনতাই পারে আপনার দুটি কিডনিকে সুস্থ ও সচল রাখতে।
