

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হওয়া মানেই পুরোনো ইতিহাস, যুদ্ধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর আবেগের এক জটিল অধ্যায়ও সামনে চলে আসে। চলমান ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে এ দু’দল। আর এতে আবারও সামনে এসেছে চার দশক আগের ফকল্যান্ড যুদ্ধ।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২–১ গোলের জয় আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ম্যাচ। দিয়েগো ম্যারাডোনার চার মিনিটের ব্যবধানে করা দুটি গোল; ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ শুধু একটি ম্যাচের ফল বদলায়নি, বরং দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
পরে নিজের আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই জয় তাঁদের কাছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক ধরনের প্রতিশোধের মতো ছিল।
ফকল্যান্ড নিয়ে পুরোনো বিরোধ
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের বিরোধ বহু পুরোনো। আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরের এই দ্বীপপুঞ্জকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে বুয়েনস এইরেস। অন্যদিকে ব্রিটেন ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে নিজেদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
দ্বীপের বর্তমান বাসিন্দাদের অধিকাংশই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। ব্রিটেনের দাবি, স্থানীয় জনগণের মতামতই দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা মনে করে, ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে ফকল্যান্ড তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ।
এই বিরোধ ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধে রূপ নেয়। ৭৪ দিন চলা সেই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জয় পায় ব্রিটেন।
গণভোট নিয়েও দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান
২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের মধ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে মত দেন। তবে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই ওই গণভোটকে স্বীকৃতি দেয়নি।
সম্প্রতি আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কির্নো দেশটির একটি দৈনিকে লেখা এক নিবন্ধে ফকল্যান্ড ইস্যুতে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি দ্বীপটির বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার বক্তব্য, দীর্ঘদিন কোনো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হয়ে যায় না। আর্জেন্টিনার দাবি, ফকল্যান্ড ইস্যুর সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
ফুটবল সমর্থকদের আবেগেও ফকল্যান্ড
ফকল্যান্ড ইস্যু আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। দেশটিতে দ্বীপপুঞ্জটি ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাদের ‘মালভিনাসের জন্য’ বিশ্বকাপ জয়ের কথা বলতে দেখা যায়।
আর্জেন্টিনার রাজনীতিতেও ফকল্যান্ড ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিভিন্ন সরকারই এই ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে এসেছে।
নতুন করে উত্তাপ কেন?
ফকল্যান্ড নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কিছু আলোচনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। আর্জেন্টিনার বর্তমান নেতৃত্বও এই ইস্যুতে আগের মতোই কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটেন বরাবরই বলে আসছে, ফকল্যান্ডের বাসিন্দাদের ইচ্ছাই দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। মাঠে লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেনদের লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্যালারিতে বয়ে যাবে বহু পুরোনো স্মৃতি ও আবেগের স্রোত। ফুটবল আবারও দুই দেশের ইতিহাসের একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে।
