সোমবার
১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্তিত্ব সংকটে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লীতে এবার ঈদ উপলক্ষে তাঁতকারখানায় বাহারি নাম ও নতুন ডিজাইনের উন্নতমানের জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, বেনারসি সহ বিভিন্ন ধরনের শাড়ি তৈরি হলেও কাঁচামালের আকাশচুম্বী দামে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের তাঁতিরা।

ঈদের বাজার ধরতে সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লীতে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হলেও তাঁতিরা ঝুঁকি নিয়ে কাপড় তৈরি করছেন। তাঁতিদের জন্য থাকা তাঁত বোর্ড গত দুই বছর ধরে কোনো প্রকার সহযোগিতা দেয়নি। উপরন্তু “জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক জারিকৃত নতুন এসআরও নং ২০০-আইন/২০২৪/৫২ কাস্টমস” বাতিল করা হয়েছে।

এখন খোলা বাজার থেকে তাঁতিরা তিন থেকে চার গুণ বেশি দাম দিয়ে সুতা, রং ও রাসায়নিক কিনে কাপড় তৈরি করছেন। আগে যে শাড়িটি তৈরি করতে ৩০০ টাকা খরচ হতো, সেটি এখন খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা। এজন্য দায়ী বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। তারা দুই বছর ধরে তাঁতিদের সুতা, রং ও রাসায়নিক আমদানির সুবিধা না দেওয়ায় খোলা বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ তাঁতিরা তিন-চার গুণ বেশি দাম দিয়ে সিন্ডিকেটকারীদের কাছ থেকে সুতা, রং ও রাসায়নিক কিনে কাপড় তৈরি করছেন এবং লোকসানের মুখে পড়ছেন। তবুও ঈদের বাজারকে কেন্দ্র করে ঝুঁকি নিয়ে কাপড় তৈরি করছেন তাঁতিরা।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কিছু অসৎ কর্মচারীর কারণে অনেক তাঁতি লোকসান গুনতে গুনতে তাঁদের অধিকাংশ তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা ঝুঁকি নিয়ে আগে ৩০০ টাকা খরচে তৈরি হওয়া কাপড় এখন ৭০০ টাকা খরচ করে তৈরি করছেন, তারা জানেন না ঈদের পরে তাদের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।

ঈদকে সামনে রেখে আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লিগুলো। প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার তাঁতিরা। তাঁত শ্রমিকদের তৈরি প্রতিটি শাড়িতে আধুনিক ও শৈল্পিক কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে নানা বাহারি নকশা। দীর্ঘদিন পর কাজের চাপ বাড়ায় বাড়তি আয়ে খুশি শ্রমিকরা।

ঈদের মৌসুম এলেই সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লিগুলোতে কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দিন-রাত যেন দম ফেলার সময় থাকে না শ্রমিকদের। সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তাঁত বুননের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও এনায়েতপুরের তাঁতপল্লিগুলো।

বাজার ধরতে রাতদিন এক করে শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত তাঁতিরা। এখানকার তৈরি শাড়ি পাইকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর তাঁতপল্লিগুলো আবার কর্মমুখর হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন শ্রমিকরা।

বেলকুচি তাঁতপল্লীর শ্রমিক সাইদুল ইসলাম জানান, এবার ঈদ উপলক্ষে কারখানায় বাহারি নাম ও নতুন ডিজাইনের উন্নতমানের জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, বেনারসি সহ বিভিন্ন ধরনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে।

তাঁত মালিক বৈদ্যনাথ রায় বলেন, বর্তমানে তাঁতশিল্পে মন্দাভাব চলছে। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে সেই মন্দা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন তাঁতিরা। শাড়ি তৈরির প্রধান কাঁচামাল রং ও সুতার বাজার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জেলার ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, জেলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। সরকারের সুদৃষ্টি পেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। জেলায় পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৫ লাখ তাঁত।

উল্লেখ্য, গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সুতা, রং ও রাসায়নিক আমদানিসহ চার দফা দাবিতে সারা দেশের তাঁতিরা তাঁত বোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে তাঁতি নেতারা বলেন, দেশের ৩০ লাখ তাঁতি ও ৬০ লাখ তাঁতশ্রমিকের চার দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে মানববন্ধনসহ এ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

তাঁতি নেতারা অভিযোগ করেন, তাঁত বোর্ডে এখনও আওয়ামী দোসর হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা বহাল রয়েছেন। বিশেষ করে তাঁত বোর্ডের মেম্বার দেবাশীষ নাগ (এসঅ্যান্ডএম) ও উপমহাব্যবস্থাপক রতন চন্দ্র সাহা (এসসিআর) তাঁতিদের আমদানি সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কারণেই চেয়ারম্যান আমদানি সুপারিশ কার্যকর করছেন না বলে অভিযোগ করা হয়।

ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তাঁতি নেতারা বলেন, এর আগে তাঁত বোর্ডের সহায়তায় সুতা, রং ও রাসায়নিক আমদানি করে স্বস্তিতে ব্যবসা করতেন তাঁতিরা। কিন্তু গত দেড় বছরে তাঁত বোর্ড তাদের কোনো আমদানি সুপারিশ দেয়নি। ফলে খোলা বাজারে এসবের মূল্য দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে যে কাপড় তৈরি করতে ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেটি তৈরি করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকা। এ কারণে দেশের অধিকাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন। এভাবে দেশের তাঁতশিল্প ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

তারা আরও বলেন, নতুনভাবে বাংলাদেশ জাতীয় তাঁতি সমিতি অনুমোদনের পর কোনো সুপারিশকৃত মালামাল আমদানি বা বণ্টন করা হয়নি। বরং নানা জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে দেশের তাঁতিরা প্রতিদিন লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এক সময় বাংলাদেশের তাঁতশিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তাঁতি নেতারা বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক জারিকৃত নতুন এসআরও নং ২০০-আইন/২০২৪/৫২ কাস্টমস (তারিখ ১৯.০৫.২০২৪) অনুযায়ী যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, সেই শর্ত মেনেই তাঁতিরা মালামাল আমদানি করে আসছেন। এর বাইরে কোনো নতুন শর্ত সাধারণ তাঁতিরা মানতে রাজি নন। বিতর্কিত তাঁত বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা কৌশলে তাঁতিদের স্বার্থবিরোধী মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।

এদিকে ঢাকার মিরপুরে ৪০ একর জায়গার ওপর তাঁতিদের পুনর্বাসনের জন্য বেনারসিপল্লী ভাষানটেক প্রকল্প তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ৪০ বছর ধরে তা ঝুলে রয়েছে। এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তাঁতিরা।

চার দফা দাবি

১. আওয়ামী দোসরখ্যাত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চলমান এসআরও নং ২০০ (তারিখ ২৯/০৫/২০২৪) বন্ধের অপতৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

২. বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বিতর্কিত মেম্বার ও ডিজিএমের অবৈধ হস্তক্ষেপে বন্ধ থাকা তাঁতিদের আমদানি সুপারিশ দ্রুত চালু করতে হবে।

৩. তাঁতিদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত তাঁত বোর্ডের মেম্বার দেবাশীষ নাগ ও ডিজিএম রতন চন্দ্র সাহার অপসারণ করতে হবে।

৪. ৪০ বছর ধরে ঝুলে থাকা মিরপুরের বেনারসি ভাষানটেক প্রকল্পে তাঁতিদের দ্রুত পুনর্বাসন করতে হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন