

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার দুজনকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে গ্রেপ্তার আসামি সিদ্ধার্থ দাসের পরনে থাকা শার্টের সঙ্গে রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সনাতন চক্রবর্তীর পরনের শার্টের মিল থাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, শার্টটি দেশের স্বনামধন্য ব্র্যান্ড আড়ংয়ের। তিনি নিজেও আড়ং থেকে একই ধরনের শার্ট কিনেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সেটি ব্যবহার করছেন।
তিনি বলেন, এটা আড়ং কোম্পানির শার্ট। আমি আড়ং থেকে কিনেছিলাম। সম্ভবত রংপুর থেকেই কিনেছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি এই শার্ট পরে আসছি।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, একই ধরনের শার্ট আসামির পরনে থাকায় প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে শুধু এ কারণে সন্দেহের কোনো ভিত্তি নেই। কারণ আড়ং যদি প্রমাণও দেয় যে শার্টটি শুধু তার কাছেই বিক্রি করা হয়েছে, তারপরও বিষয়টি দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
দুই ব্যক্তি মিলে কীভাবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করতে পারে, এ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, চারজনকে কিন্তু একসঙ্গে হত্যা করা হয়নি। প্রথমে স্যারকে হত্যা করা হয়েছে। দুইজন মিলে হত্যা করেছে। এরপর ম্যাডামকে একইভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারপর তৃতীয় ব্যক্তিকে এবং সর্বশেষ বাচ্চাটাকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে তদন্ত এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলেও জানান তিনি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ঘটনাস্থলে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করার পর হত্যায় অভিযুক্তরা বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির ডিসি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছে, বাড়িটি অন্ধকার করে দেওয়ার জন্য তারা বিদ্যুতের লাইন কেটেছিল। তাদের কাছে একটি প্লায়ার্স ছিল। পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার করে গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির মিটারের কাছ থেকে বিদ্যুতের তার কাটা হয়।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করেছিল, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে লাইন কাটা হয়েছিল। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, খুঁটি থেকে নয়, মিটারের কাছ থেকেই তার কাটা হয়েছে।
মরদেহের মুখ ঝলসানো বা মুখে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে কেমিক্যাল ব্যবহার করে মরদেহের মুখ ঝলসানো হয়েছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাটির প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছিল।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, এত সময় পর মৃতদেহে পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এ সময় শরীরের ভেতরের তরল বিভিন্ন পথ দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। ঘটনাস্থলে মুখের কাছে রক্তের মতো যে তরল দেখা গেছে, সেটি রক্ত না হয়ে মৃতদেহের শরীরের তরল হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
এ ছাড়া মৃত্যুর প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় পর মৃতদেহের ত্বকে ফোসকা বা ব্লিস্টার তৈরি হতে পারে। এতে বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে, মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বা কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকও জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় মরদেহ পড়ে থাকলে এ ধরনের পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে ঘটতে পারে। তবে কোনো রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানতে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রয়োজন।
নিহত দুই নারীকে ঘিরে কোনো যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছিল কি না, এমন প্রশ্নও উঠেছে। এ বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত যৌন নিপীড়নের কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে বিষয়টি পুরোপুরি নাকচও করা যাচ্ছে না।
এদিকে নিহতদের ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তাদের কাছে মনে হয়েছে গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর হত্যার ধরন সম্পর্কে আরও নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে আটক দুই ব্যক্তি রোববার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই রাতে নিহতদের সৎকারও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার।
রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা পুলিশ প্রায় গুছিয়ে এনেছে। খুব দ্রুত আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, আটক ওই দুইই গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে পর্যায়ক্রমে হত্যা করেছে। এখন তাদের দেওয়া জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।


