মঙ্গলবার
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারাগারে কেটেছে মেয়ের শৈশব, খালাসের পর বাবার আকুতি—‘রাথি কি চিনবে আমাকে?’

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৫ এএম আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ এএম
হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া আসামি কামরুন নাহার মণি। ছবি: সংগৃহীত
expand
হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া আসামি কামরুন নাহার মণি। ছবি: সংগৃহীত

‘বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না’ বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন নুসরাত হত্যামামলায় হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া আসামি কামরুন নাহার মণির স্বামী রাশেদুল আলম খান।

সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে, সাত বছর বয়সী মেয়েকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা, কারাগারের জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা, দূরত্বের কারণে মেয়ের কাছে অপরিচিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিন পর মেয়ের সামনে দাঁড়ানোর উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন তিনি।

রাশেদুল আলম লেখেন, বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না আজও আমি! খুব ইচ্ছে করত রাথিকে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য, সুযোগ ছিল না কড়া নিরাপত্তার জন্য। জেলখানায় স্পেশাল করে দেখা করা যেত ফেনী কারাগারে। জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে দিতাম। মুখে হাত লাগিয়ে আদর করতাম, তাও দূর থেকে। কাশিমপুর চলে যাওয়ার পরে মাঝখানে ২ ফুট গ্যাপের খাঁচা, ঠিকমতো মেয়েটা দেখতেই পারে না আমাকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত সেই নয়নজুড়ানো কালো দুটি চোখে। আমাকে চিনত না সে, চিনবেই বা কেমনে, দেখাই তো যায় না খাঁচার ভেতর দিয়ে। এইভাবেই সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। সারাদিন সবার সাথে হাসিখুশি থেকে রাতভর যন্ত্রণায় ছটফট করা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আমাকে অনেকেই জ্ঞান দিত, স্ত্রীর সাথে শুয়ে কিংবা বাচ্চা বুকে নিয়ে। বাস্তবতা আমি পার করেছি, আর্তনাদ এক আল্লাহ ছাড়া কেউ শোনেনি।

তিনি আরও লেখেন, আজ প্রায় অনেকদিন মেয়েটার সাথে দেখা হয় না, শুক্রবারে একটু কথাও হয় না মোবাইলে। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট কোনোদিন কাউকে বুঝতে দিইনি। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, যে ক্ষতি নিজের আমি করেছি, কোনোদিন আমাকে আমি যদি ক্ষমা করতে চাই, পারব? ১৯ সালে প্রশাসন দ্বারা মারা গেলে কিংবা আমাকে গুম করে ফেললে কী হতো? শুধু মেয়েটাকে কোলে নেব, ইচ্ছেমতো আদর করব-এই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। ঝড় থেকে যাদের রক্ষা করতে ছাতা নিয়ে ঝড়ের মধ্যে দৌড়েছি, তারাও দরজা বন্ধ করে আমাকে ঝড়ের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। কষ্ট এক দিক থেকে পাইনি, এমন অবস্থা হয়েছে, এখন সব সয়ে গেছে আমার। মেয়েটা ফিরে আসুক, বাবা হওয়ার প্রথম স্পর্শ, প্রথম আলিঙ্গন বুকটা ভরিয়ে দিক। আর কিছুই চাওয়ার নেই আমার।

মেয়েকে নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে রাশেদুল আলম খান লেখেন, এই সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ রাথির ৭ বছর পূর্ণ হবে। তাকে ছাড়া ১৪টা ঈদ, ৭টা জন্মদিন আমি পার করেছি। কী নিষ্ঠুর বাবা আমি। মেয়েটার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। আমার প্রতিটা মুহূর্তের এক আল্লাহ সাক্ষী আছেন। জানি না আমাকে চিনবে কিনা রাথী, জানি না আমি কিভাবে তার সামনে দাঁড়াবো। অস্থির অস্থির লাগছে আমার।

এর আগে ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নুসরাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারেই ঠাঁই হয়েছিল অন্তঃসত্ত্বা মণির। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মণির প্রসববেদনা উঠলে কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কন্যা সন্তানের মা হন মণি। হাসপাতালে দুইদিন বাবা-মাসহ পরিবারের সান্নিধ্য পায় শিশুটি। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে কারাগারের অন্ধ কুঠুরিতে দিন কাটে শিশুটির। পরবর্তী নিম্ন আদালতে শুধু নিজেই এই রায় শোনেননি, রায় শুনেছেন তার এক মাস বয়সী নবজাতকও।

শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বিরা খানম রাথী। মণির স্বামীর দাবি, নুসরাত জাহান রাফির নামানুসারে তার নাম রাখা হয়েছিল। যদিও মণি তার মেয়েকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন বলে জানা গেছে।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ। রায়ে তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মণি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন