রবিবার
২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কমলগঞ্জে কমলা বাগান কাটার নেপথ্য অনুসন্ধানে উঠে এলো যত অসংগতি

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০১:০৩ এএম
ছবি: এনপিবি
expand
ছবি: এনপিবি

কমলগঞ্জ উপজেলার এক কৃষকের কমলা বাগান উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি, সরকারি বনভূমি দখল এবং বিপুল ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অভিযোগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অসঙ্গতি উঠে এসেছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কৃষক আলীম উল্লাহ প্রায় আট বছর ধরে সংরক্ষিত বন বিভাগের প্রায় পাঁচ একর জমিতে কমলার বাগান করে আসছিলেন। তবে ওই জমি ব্যবহারের পক্ষে তার কাছে কোনো বৈধ লিজ, বন্দোবস্ত বা সরকারি অনুমোদনের নথি নেই।

গত ১৬ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেট, প্রশাসনের লোক ও বন বিভাগের উপস্থিতিতে ওই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। এর পরই কৃষক আলীম উল্লাহ অভিযোগ করেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সেই অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় প্রায় ১২০০ ফলন্ত কমলা গাছ কেটে ফেলা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনা হয়।

বিষয়টি অনুসন্ধান করতে সরেজমিনে যায় এনপিবি নিউজ; তবে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন কিছু। সরকারি জমি দখল করে বছরের পর বছর ভোগ করে আসছেন আলিম উল্লাহ পরিবার, যার কোনো বৈধ ডকুমেন্টস নেই। এদিকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ একেক জন বলছেন একেক কথা, এ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

কমলা চাষি আলিম উল্লাহ বলেন, কমলা গাছ কেটে নেয়ায় আমার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকার কাছাকাছি। এদিকে আলিম উল্লাহর বাবা জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৫-৩০ লক্ষ টাকা। আবার সরকারি জমিতে আলিম উল্লাহর এই কমলার বাগানে কাজ করা তার বোন জামাই ওয়াসিম মিয়া জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৫০ লক্ষ টাকা। তবে আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বলেন ভিন্ন কিছু।

তিনি বলেন, এই কমলা গাছ রোপণ থেকে শুরু করে সবকিছুর হিসাব তার কাছে আছে।

সালমা বেগম বলেন, "আমার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন শিক্ষিত না, আমি পড়াশোনা করেছি তাই আমিই সব হিসাব রেখেছি কোথায় কি পরিমাণ খরচ হইলো না হইলো। সত্যি বলতে ভাই আমাদের এখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৫-১৬ লক্ষ টাকা।"

আবার আলিম উল্লাহর পিতা মহিবুল্লাহ জানান, এই বছর নিয়ে ৩ বার কমলা গাছে ফল এসেছে।

প্রথম বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার কমলা বেচেন, পরের বছর ৪ থেকে সাড়ে ৪ লক্ষ টাকা এবং এবার আনুমানিক ৫ লক্ষ টাকা বেচতে পারতেন। ফলে ঠিক কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

কতটি গাছ বন বিভাগ কেটেছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে আলিম উল্লাহ বলেন, ১৫০০ কমলা ও মালটা গাছ। তার স্ত্রী বলেন, ১০০০০-১২০০ গাছ; আবার ১০০০ এর মতো গাছ ছিল বলে একই কথা জানান আলিম উল্লাহর বাবা ও বোন জামাই।

এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় তাদের এই তথ্যের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।

কমলা ও মালটা গাছের সারি রয়েছে ৪৭ টি; প্রতিটি সারিতে ৫ টি করে গাছ রয়েছে। গুটি কয়েক সারিতে ৬ টি এবং অল্প কয়েকটা সারিতে ৭টিও গাছ রয়েছে। গড়ে ৫ টি করে ধরলে হিসাব আসে ২৩০-২৩৫ ও গুটি কয়েক সারিতে ৬-৭ টি গাছের হিসাব করলে আড়াইশও পেরোয় না। এমনকি একটা টিন শেডের ঘর, বন কেটে করা হয় বড় একটা পুকুরও, সেখানে মাছ চাষ করে আসছিলেন বলে স্বীকার করেন আলীম উল্লাহর বোন জামাই ওয়াসিম মিয়া।

তবে মিডিয়ায় একক ভাবে আলিম উল্লাহর পরিবারের বক্তব্য প্রচার নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ, কেননা একাধিক মিডিয়ায় ছড়িয়েছে ১২০০, ১৫০০, এমনকি ২০০০ গাছেরও নিউজ, যার সাথে বাস্তবে কোনো মিল নেই।

এদিকে আলিম উল্লাহ পরিবারের অভিযোগ, চাঁদা না দেয়ায় বন বিভাগ গাছ কেটেছে। কত টাকা চাঁদা চেয়েছে জানতে চাইলে এ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কেননা, আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বলছেন, ৫০ হাজার টাকা চাঁদা না নেয়ায় আমাদের বাগান কেটে ফেলেছে তারা।

সালমা বেগম বলেন, ”বন বিভাগের অর্জুন ও প্রীতম আমাদের বাড়িতে রাতে লোক পাঠায়, পরে চাঁদা দাবি করে; এতে আমার স্বামী তাদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। আমরা দেব না বলে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমার শ্বশুরকে বন্দুকের গোঁড়া দিয়ে পেছনে মারে।”

এদিকে আলিম উল্লাহ জানান, তার কাছে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়; না দেয়ায় গাছ কেটে ফেলা হয়।

আলিম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ৮ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছি আমরা; আগে এতো বেশি টাকা দেয়া লাগতো না তবে গত ৩ বছর ধরে প্রীতম বেশি জ্বালাচ্ছে আমাদের, যেকোনো সময় টাকা দাবি করে এসে লোক পাঠায় বাড়িতে।

আবার আলিম উল্লাহর পিতা জানান, তারা আগে থেকেই বন বিভাগকে টাকা দিয়ে আসছেন।

প্রথমে ৫০ হাজার টাকা বছরে, পরে ২০ হাজার করে, তারপর ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন; ৩ বার টাকা দিয়েছেন সব মিলিয়ে ৮৫ হাজার টাকা।

তিনি জানান, উনার ভাগিনা সালামের মাধ্যমে বন বিভাগকে দিয়েছেন ১৫ হাজার, লাল হেডম্যানের ছেলের মাধ্যমে দিয়েছেন ৫০ হাজার এবং বাকি ২০ হাজার কার মাধ্যমে দিয়েছেন সে বিষয়ে বলেন নি তিনি। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী টাকাগুলো গিয়েছে আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারের কাছে।

আলিম উল্লাহর স্ত্রীর অভিযোগ অনুযায়ী প্রীতম বড়ুয়া ৩ বছর ধরে টাকা আদায় করেছেন দাবি করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলগঞ্জের রাজকান্দি রেঞ্জে প্রীতম বড়ুয়া সহকারী বন রক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন মাত্র ৭ মাস হয়েছে!

তবে আলিম উল্লাহ একাধিকবার প্রীতম বড়ুয়া ও অর্জুন কান্তিকে চাঁদার বিষয়ে দোষারোপ করলেও বড় অভিযোগ এনেছেন আদমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেনের বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, "গাছগুলা কেটে ফেলার সময় আমি চেয়ারম্যানকে ফোন করলে চেয়ারম্যান আমাকে বলেন, 'গাছ কাটতেছে, ঘর তো আর কাটেনাই'—এ বলেই ফোন কেটে দেন। এতে আমি অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছি। উনার সাথে আমি কী অপরাধটা করলাম? নির্বাচনের সময় ঢাকা থেকে এসে উনাকে আমি ভোটটা দিয়েছি। আমি এখন সত্যি কথা বললাম ভাই, এই বাগান কাটার পেছনে চেয়ারম্যানেরও হাত আছে; আমি মনে করি না অন্য কারো হাত আছে।"

এদিকে আবার কমলা বাগান করার জন্য লোন নিয়েছেন বলেও জানান আলিম পরিবার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে প্রত্যয়নপত্র নেন তারা; সেটার মাধ্যমেই ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও-র কাছ থেকে লোন নিয়েছেন, কিছু লোন শেষ এবং কিছু লোন এখনও চলমান। তবে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা ৬ হাজার গাছ নিয়ে।

আদমপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ আছে, "আলীম আমার পরিচিত, ২০ বিঘা জমিতে ৩ বছর আগে ৬ হাজার কমলার চারা গাছ দিয়ে চাষ শুরু করেন আলীম। প্রতিটি গাছে ফল চলে আসছে এবং টাকার অভাবে গাছ পরিচর্যা হচ্ছে না। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা পেলে বাগান পরিচর্যা করে লাভবান হবে সে।"

আলীম উল্লাহ পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী তারা গাছ রোপণ করেন ১ হাজার থেকে ১৫শ; সেখানে ২০২২ সালের ২৪ মে আদমপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদাল হোসেনের স্বাক্ষরিত লোনের জন্য প্রত্যয়নপত্রে ৬ হাজার গাছ উল্লেখ করে কেন দিয়েছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।

ফলে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, ঠিক কত টাকা তারা লোন নিয়েছে পরিবারটি, কেননা আলীম উল্লাহর স্ত্রী সালমা বেগম জানান, প্রতিটি চারা গাছের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

অসংগতি ও ধোঁয়াশার মধ্যে এদিকে আবার গুরুতর এক অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান, তাকে প্রথমে দখলের পক্ষে নিউজ করার জন্য ১০ হাজার টাকার অফার দিলে তিনি নাকচ করে দেন; পরে ওয়াসিদ আহমদ নামক আদমপুর ইউনিয়ন যুবদল আহ্বায়ক সাংবাদিক ম্যানেজ করে দেন আলীম পরিবারকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসিদ আহমদ জানান, "এমপি মহোদয়ের নির্দেশে আমি সেখানে গিয়েছি এবং তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছি প্রেসক্লাবে যেতে। তাছাড়া আমার জানামতো কোনো সাংবাদিককে টাকা পয়সা দেয়া হয়নি।"

টাকা দিয়ে নিউজ করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সংরক্ষিত বন বিভাগের জমিতে কমলা চাষি আলীম উল্লাহ বলেন, "এগুলা ফালতু কথা। আমি কোনো সাংবাদিকের কাছে গিয়ে ধরনা ধরিনাই।"—এ বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

পরে আবার কল দিলে তিনি বলেন, "এ কথা কেন বললেন আমাকে? আপনি সামনাসামনি আসেন কথা বলি, ফোনে কোনো কথা বলবো না।"

আদমপুর বিট কর্মকর্তা অর্জুন কান্তি দস্তিদারের বিরুদ্ধে টাকা নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেন নি।

চাঁদা দাবি ও গাছ কর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে কমলগঞ্জের রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন রক্ষক প্রীতম বড়ুয়া বলেন, “আমি এখানে এসেছি মাত্র ৭ মাস হয়েছে। ৭ মাসে আমি ৬ টি দখল উচ্ছেদ করে সরকারকে সহযোগিতা করি এবং ৯ লক্ষ টাকার রাজস্ব উদ্ধার করে সরকারই কোষাগারে জমা দেই। তাছাড়া বন বিভাগের আইন অনুযায়ী আমরা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করি। প্রায় ২-৩ মাস আগে তাদেরকে নোটিশ দিয়েছি মৌখিকভাবে তবে বারংবার বলার পরও তারা শুনেনি। সর্বশেষ ২২/৪/২০২৬ তারিখে আমরা তাদেরকে উচ্ছেদ করবো বলে সতর্ক করতে গেলে আমাদের দুজন গার্ডের একজনকে তারা মারধর করে জখম করে ফলে পরবর্তীতে মামলা রজু করা হয়। এছাড়া সংরক্ষিত বনে বাণিজ্যিকভাবে প্রজেক্ট আকারে পাহাড় কেটে ফিশারি করে মাছ চাষ, কমলা, মাল্টা, সুপারি গাছ ও আনারস চাষ করছিল তারা। আমরা বন আইন ১৯২৭ মোতাবেক তাদেরকে উচ্ছেদ করি এবং আমাদের এই কার্যক্রম চলমান থাকবে। যে ই আমাদের কাজে বাধা প্রদানের চেষ্টা করবেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব। তাছাড়া চাঁদা দাবির বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের কাজে বাধা দেয়ার জন্য এবং আমরা যাতে আমাদের কাজ সফলভাবে করতে না পারি সেজন্য উদ্দেশপ্রণোদিতভাবে আমাদের নামে মিথ্যা অপ্রপচার চালানো হচ্ছে।”

চাঁদা না দেয়ায় সংরক্ষিত বনের সরকারি জমিতে চাষ করা কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগের পর ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার তদন্ত করতে আসেন বন বিভাগের সিলেট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা; এখন পুরো ঘটনাটি তদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে আছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন