বৃহস্পতিবার
১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোররাতের আগুন কেড়ে নিলো ৩ হাজার মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২২ এএম
আগুন শেষ শত শত বসতঘর
expand
আগুন শেষ শত শত বসতঘর

গভীর রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ। ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল পুরো রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ঠিক সেই সময়েই হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা আর আতঙ্কিত মানুষের চিৎকারে ভেঙে যায় সব শান্তি। মুহূর্তেই আগুন গ্রাস করে নেয় শত শত বসতঘর। সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন অন্তত তিন হাজার রোহিঙ্গা।

কক্সবাজারের উখিয়ার ১৬ নম্বর শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে। প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও এর আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় বসতঘর, শিক্ষা কেন্দ্র ও উপাসনালয়।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, মধ্যরাত আনুমানিক তিনটার দিকে ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকের একটি শেডে আগুনের সূত্রপাত হয়। বাতাসের তীব্রতায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের ঘনবসতিপূর্ণ শেডগুলোতে। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্লকে। প্রাণ বাঁচাতে শিশু ও বৃদ্ধদের কোলে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন বাসিন্দারা। খবর পেয়ে উখিয়া, রামু ও টেকনাফ থেকে ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।

প্রায় চার ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে পুড়ে গেছে অন্তত ৪৪৮টি ছোট-বড় বসতঘর। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০টি লার্নিং সেন্টার, একটি মক্তব এবং দুটি মসজিদ। এই অগ্নিকাণ্ডে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা। আগুনে সব হারিয়ে এখন তারা খোলা আকাশের নিচেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

ক্যাম্প ১৬-এর ডি-২ ব্লকের বাসিন্দা হাফেজ কলিমউল্লাহ বলেন, রাত তিনটার দিকে আগুন লাগে। পুরো ব্লক পুড়ে শেষ। আমার ল্যাপটপ, রেডিও- সব শেষ। সকালে শীত, এখন রোদ- কোনো আশ্রয় নেই। আর কিছুক্ষণ পর রাত নামবে, তখন কষ্ট আরও বাড়বে।

একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সখিনা খাতুন বলেন, সকাল থেকে কিছু খেতে পাইনি। বয়স্ক শাশুড়ি আর ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। কীভাবে যে দিন কাটছে, আল্লাহ জানেন।

ডি-৪ ব্লকের রোহিঙ্গা মোহাম্মদ ফিরোজ বলেন, হঠাৎ চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি চারদিকে শুধু আগুন। কোনোমতে বউ-বাচ্চাদের বের করেছি। কিন্তু পরিচয়পত্র, কাপড়, রান্নার জিনিস, গ্যাস সিলিন্ডার—সব আগুনে শেষ। এখন খোলা আকাশের নিচে অসহায়ভাবে বসে আছি।

ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মো. মোরশেদ হোসেন বলেন, রাত আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটে আগুন লাগার খবর পাই। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উখিয়া ফায়ার স্টেশন ও ক্যাম্পের ভেতরে থাকা ফায়ার সার্ভিসের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি কক্সবাজার সদর, রামু ও টেকনাফ থেকে ইউনিট আসে। মোট আটটি ইউনিট কাজ করে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সকাল ৭টা ৩৮ মিনিটে সম্পূর্ণভাবে আগুন নির্বাপণ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে ৪৪৮টি বসতঘর, ১০টি লার্নিং সেন্টার, একটি মক্তব এবং দুটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে আগুনের সঠিক কারণ জানা যাবে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বসতঘরের চুলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা তৈরির কাজ চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে এমন অগ্নিকাণ্ড নতুন নয়। তবে প্রতিবারই আগুন কেড়ে নেয় মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু। আগুন নেভে, কিন্তু পুড়ে যাওয়া জীবনের ক্ষত আর দীর্ঘশ্বাস থেকে যায়। এমনই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS England
Scheduled
19 Jul, 03:00 AM
VS
World Cup