মঙ্গলবার
০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে বৃষ্টির তাণ্ডব পাহাড়ধসে ১২ জনের মৃত্যু

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
ছবি: এনপিবি নিউজ
expand
ছবি: এনপিবি নিউজ

টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধস, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় জেলার অন্তত ৯টি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এদিকে পাহাড়ধস ও ঘরধসের ঘটনায় গত দুইদিনে জেলায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথ।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

টানা বৃষ্টির মধ্যে রোববার দিবাগত রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। একই সময় কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আরও একজন। পেকুয়া উপজেলায় মাটির ঘর ধসে মারা যায় একটি শিশু। সর্বশেষ মঙ্গলবার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের বড়ছড়া এলাকায় পাহাড়ধসে নিহত হন গৃহবধূ নাছিমা আক্তার লিমা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার স্বামী জসিম উদ্দিন। সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে জেলায় পাহাড়ধস ও ঘরধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২ জনে দাঁড়িয়েছে।

পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার শহর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্তত এক হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বৃষ্টি কিছুটা কমলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি বহাল থাকবে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেকনাফ উপজেলা। হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, ইউনিয়নের অন্তত ৪০০টি ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন সড়ক। শতাধিক কাঁচা ঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মো. অনীক চৌধুরী বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বিচ্ছিন্ন সেন্টমার্টিন, পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি দুই শিক্ষার্থী:

উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথ। এতে দ্বীপটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্ট মার্টিনের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী টেকনাফে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। জেলা প্রশাসন তাদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

শহরে জলাবদ্ধতা, ভেঙে পড়েছে সেতু:

কক্সবাজার পৌরসভার হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পর্যটকেরাও।

অন্যদিকে কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সড়কের একটি জরাজীর্ণ সেতু ভেঙে পড়ায় দুই এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নতুন করে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজারে একই ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং সীমিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কারণে জেলার মানুষকে বারবার একই সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সাময়িক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Argentina VS Egypt
Scheduled
07 Jul, 10:00 PM
VS
World Cup