বুধবার
০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার বার্তা নিয়ে তরুণের ৬৪ জেলা ভ্রমণ

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
expand
থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার বার্তা নিয়ে তরুণের ৬৪ জেলা ভ্রমণ

​রাত তখন গভীর। অচেনা এক জেলার ঝাপসা হয়ে আসা এক ছোট্ট বাজার। সারাদিনের ধুলোবালি আর ক্লান্তি মেখে এক কোণে বসে আছেন এক তরুণ। পকেটে এক কানাকড়িও নেই, সামনে অনিশ্চিত গন্তব্য—তবুও এক তরুণের চোখে ক্লান্তিকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তি খেলা করছে। কারণ, দিনভর অন্তত শতাধিক মানুষকে তিনি একটি প্রাণঘাতী শব্দের গভীরতা বুঝিয়ে এসেছেন— “থ্যালাসেমিয়া”।

​তিনি শেখ জাহিদ হাসান। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান। কিন্তু তার স্বপ্নটা ছিল অসাধ্য সাধনের। কোনো সঞ্চয় বা স্পন্সর ছাড়াই কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মানুষের ভালোবাসাকে সঙ্গী করে মাত্র ৬১ দিনে দেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন তিনি। উদ্দেশ্য একটিই—অজ্ঞতার অন্ধকারে থাকা মানুষদের থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন করা।

​ফটিকছড়ির হেয়াকো বনানী ডিগ্রি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জাহিদ ৯ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার নিজ উপজেলাতেই প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান তাকে ভাবিয়ে তোলে। জাহিদ বুঝতে পারেন, মানুষের অসচেতনতাই এই রোগ বিস্তারের প্রধান কারণ। সেই তাড়না থেকেই গত বছরের ১ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি থেকে কাঁধে ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ​মধ্যবিত্ত পরিবারের এই তরুণের পকেটে ছিল না টাকা, কিন্তু ছিল মানুষের ওপর অগাধ বিশ্বাস।

জাহিদ জানান, তার পথচলা সহজ ছিল না। কখনো বাসের সিটে, কখনো ট্রাকের ছাদে চড়ে আবার কখনো দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে তিনি পাড়ি দিয়েছেন এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। ছিল না খাবার ও জীবনের নিশ্চয়তা, আবার কখনো রাত কেটেছে অপরিচিত মানুষের বারান্দায় কিংবা সস্তা হোটেলে।

​জাহিদ বলেন, ​“আমি যখন চালক বা সাধারণ মানুষকে আমার উদ্দেশ্যটা বলতাম, তারা সানন্দে আমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতেন। কেউ হয়তো নিজের দুপুরের খাবারটা ভাগ করে দিয়েছেন, কোনো রেস্তোরাঁ মালিক ভালোবেসে ফ্রিতে খাইয়েছেন। এ যেন এক মানবিক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।”

​পুরো ভ্রমণে জাহিদ কেবল ঘোরেননি; তিনি স্কুল-কলেজ, বাসস্ট্যান্ড ও জনবহুল মোড়ে মোড়ে লিফলেট বিলি করেছেন। থ্যালাসেমিয়া যে একটি বংশগত রোগ এবং বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করলে যে এটি প্রতিরোধ সম্ভব—এই সহজ সত্যটি তিনি পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের কানে। লিফলেট তৈরির সামান্য খরচটুকুও জুগিয়েছেন তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তার এই মহতী উদ্যোগে মানসিক সাহস জুগিয়েছে ‘ফটিকছড়ি ব্লাড ডোনার্স ক্লাব’।

​চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসে শেষ হয় জাহিদের এই ব্যতিক্রমী মিশন। ১০ দিনের বিরতি বাদে মোট ৬১ দিনেই তিনি পূর্ণ করেন তার মানচিত্র।

জাহিদের ভাষায়, ​“একদিন হয়তো আমার টাকা হবে, কিন্তু তখন মানুষের জন্য কাজ করার এই অখণ্ড সময়টা থাকবে না। আমার এই দীর্ঘ পথচলায় যদি ৬৪ জেলার অন্তত ৬৪ জন মানুষও সচেতন হয়, তবেই আমার এই পরিশ্রম সার্থক।”

​ভবিষ্যতে অভাবের তাড়নায় হয়তো জাহিদকে পাড়ি জমাতে হবে প্রবাসে, কিন্তু তার স্বপ্ন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই তরুণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে চান।

​জাহিদ প্রমাণ করেছেন, মহৎ উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়লে পথ কখনো ফুরিয়ে যায় না; বরং পথের প্রতিটি ধূলিকণাই হয়ে ওঠে একেকটি আশার প্রদীপ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন