

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। নির্বাচনী মাঠ কেমন চ্যালেঞ্জ ছিলো, এমপি এবং মন্ত্রী হওয়ার অনুভূতি, বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা, অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা রোধসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন এনপিবি নিউজের সঙ্গে। প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনপিবি নিউজের প্রতিবেদক মো. ইলিয়াস।
এনপিবি নিউজ : আপনার নির্বাচনী মাঠে কেমন চ্যালেঞ্জ ছিলো?
নুরুল হক নুর : পটুয়াখালী-৩ আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকা। এখানে রাজনৈতিক বিভাজন ছিল। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর (হাসান আল মামুন) ওয়াইফ সরকারের যুগ্ম সচিব ছিল। নির্বাচনী মাঠে প্রশাসনিক চাপ অনুভব করেছি। সামগ্রিকভাবে একটি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে আগাতে হয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে সংঘাত, সহিংসতা ও পেশিশক্তি; নির্বাচনের সময় অনেক নেতা কর্মীদের বাড়িতে হামলা করা হয়েছে, নির্বাচনে অফিসে আগুন দেয়া হয়েছে। সকল চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে। ভয়ে হয়তো অনেকে আমাকে সমর্থন করতে পারেনি, কিন্তু ব্যালটের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে।
এনপিবি নিউজ : প্রথমবার ভোটে দাঁড়িয়ে এমপি এবং মন্ত্রী হওয়ার অনুভূতি কেমন?
নুরুল হক নুর : প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু প্রার্থী হওয়া নয়, আমি প্রথমবার ভোট প্রদান করেছি এবং জনগণের সমর্থনে এমপি হয়েছি। এটা আমার কাছে বড় পাওয়া মনে হয়। নির্বাচনের পরে জাতীয় সংসদে যাওয়ার জন্য এলাকার মানুষের সমর্থন সহযোগিতা পেয়েছি। প্রতিমন্ত্রী হয়েছি এটা ফিল হয় না; বরঞ্চ বাড়তি চাপ মনে হয়। দায়বদ্ধতা এবং চাপ অনুভব করি। কারণ এখানে এত মানুষের এক্সপেক্টেশন (প্রত্যাশা); দেশের বাইরে এত কমিউনিটি, তারা আমাকে একজন আন্দোলনকারী সংগ্রামী মানুষ হিসেবে জানে। তাদের জন্য কাজ না করতে পারলে মানুষের ভালোবাসা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
এনপিবি নিউজ : দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আপনার প্রধান অগ্রাধিকার কী?
নুরুল হক নুর : বেশ কিছু লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য যারা বিদেশে যায়, এক্ষেত্রে তার নানান ধরনের হয়রানির শিকার হয়। পাসপোর্ট করা থেকে তাদের হয়রানি শুরু হয়। দেশের বাইরে গিয়েও অনেকে ভালো কাজ পায় না। বিদেশে যাওয়ার জন্য তাদের উচ্চ মূল্য বহন করতে হয়। সে ক্ষেত্রে আমারা ভাবছি বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য অভিবাসন ব্যয় মূল্য নির্ধারণ করে দেব। প্রবাসীদের জন্য একটি ডেক্স থেকে সব ধরনের সেবা দেয়া যায় কিনা সেটা চিন্তা করছি। যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের দক্ষতা এবং ট্রেনিং না থাকার কারণে অনেকে কম পয়সা বেতনে চাকরি এবং মানবেতর জীবনযাপন করে। সেক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি দেশের বাইরে পাঠানো। অর্থাৎ ন্যূনতম বেসিক ট্রেনিং করে তারা যেন ওখানে যেতে পারে। প্রবাসীরা অনেকেই অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে পারে না, সেক্ষেত্রে তারা যাতে অনলাইনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা নিতে পারে সেই পরিকল্পনা রয়েছে।
এনপিবি নিউজ : বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন বাজার তৈরিতে সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা কী?
নুরুল হক নুর : সরকারের ইশতেহারে বড় চ্যালেঞ্জ এবং কমিটমেন্ট পাঁচ বছরে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। নতুন কর্মসংস্থান বাজার খোলার ক্ষেত্রে অল্প খরচে বিদেশে যাওয়া নিশ্চিত করা। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ এবং এশিয়াসহ যে সকল দেশে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। এছাড়া মালেশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সেটা ওপেন (খোলার) করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এনপিবি নিউজ : দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে কীভাবে আধুনিক করা হচ্ছে?
নুরুল হক নুর : আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১০টি ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। অন্তত প্রতিটি জেলায় একটি করে ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে। চেষ্টা করব জেলায় যাতে সব ধরনের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। আধুনিক এবং পুনর্বিন্যাস করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখান থেকে প্রবাসীরা যাতে কিছুটা দক্ষ হয়ে যেতে পারে সেই চেষ্টা চলছে। ট্রেনিং সেন্টারের সার্টিফিকেট যেন বিভিন্ন দেশে মূল্যায়ন করা হয় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।
এনপিবি নিউজ : ভাষার এবং কাজের দক্ষতা নিয়ে শ্রীলংকা ও ভারতের যারা বিদেশে যাচ্ছেন তারা তুলনামূলক ভাবে বাংলাদেশিদের থেকে বেশি বেতন পাচ্ছেন। দক্ষতার অভাবে কম বেতন পাচ্ছে বাংলাদেশিরা। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ কি?
নুরুল হক নুর : অন্য দেশগুলোর নাগরিকরা প্রবাসে গিয়ে উচ্চ বেতনের চাকরি করলেও সেই সুবিধাটা আমরা নিতে পারছি না। কারণ দক্ষতা এবং স্কিলের ঘাটতি। সে ক্ষেত্রে ট্রেনিং সেন্টার এবং অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড এর কিছু লোককে পাঠানোর চেষ্টা করছি। ভারত পাকিস্তান শ্রীলঙ্কার প্রবাসীরা বিদেশে অল্প খরচে যেতে পারলেও বাংলাদেশীরা সেটা পারছে না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে শ্রম বাজারে মাফিয়াদের একটি আধিপত্য বলয় বা সিন্ডিকেট রয়েছে। যার ফলে খরচ কমানোর উদ্যোগ এতদিন কার্যকর হয়ে ওঠেনি। আমাদের লক্ষ্য যে কোন মূল্যে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে মানুষ যাতে অল্প খরচে বিদেশে যেতে পারে সেই লক্ষ্য নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে জনগণের সমর্থন ও সন্তুষ্টি ধরে রাখার জন্য জনকল্যাণমুখী কাজ করতে হবে।
এনপিবি নিউজ : বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়া শ্রমিকদের সংখ্যা কমাতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
নুরুল হক নুর : দেশে যে সকল রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে এগুলো যাচাই-বাছাই করে পুনরায় নিবন্ধন দেওয়ার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক এজেন্সি রয়েছে যাদের নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার নেই, অফিস নেই, কাজ করার ক্যাপাসিটি নেই তারাও বিভিন্ন সুপারিশে লাইসেন্স পেয়েছে। যারা প্রতারণা করছে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
এনপিবি নিউজ : অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা যখন সমস্যায় পড়েন তখন তারা তাৎক্ষণিক দূতাবাসে যোগাযোগ করতে পারে না বা যোগাযোগ করলেও তেমন সাহায্য পায় না বিষয়টি কী ভাবে দেখছেন?
নুরুল হক নুর : এটা শুধুমাত্র বিদেশ নয়, বাংলাদেশের যে সমস্ত সরকারি অফিস আদালত রয়েছে সেখানেও একই অবস্থা। তারা যখন সেবার জন্য যায় তখন হয়রানির শিকার হয়। যারা দায়িত্বে থাকেন তাদের আচার-আচরণ নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হন। মানুষের সমস্যাগুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করতে হবে। এ বিষয়গুলো আমরা নজরদারিতে রাখছি। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী এবং দূতাবাসে যারা রয়েছেন তারা যাতে কাজেকর্মে পরিবর্তন আনে এ বিষয় আলোচনা হয়েছে।
এনপিবি নিউজ : অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা রোধে আপনার করণীয় কী?
নুরুল হক নুর : যারা অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছে বা যে এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে যাচ্ছে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম সভা সেমিনার আয়োজন করতে হবে। কারণ সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি, আপনি বেঁচে থাকলে অনেক কিছু করতে পারবেন। ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপ যাওয়া, এছাড়া বন জঙ্গল পাহাড় পর্বত দিয়ে প্রবাসে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের জীবনকে অনিশ্চিয়তা করে দেওয়ার কোন মানে হয় না।
এনপিবি নিউজ : মন্ত্রণালয়ে আপনার মেয়াদকালে কী পরিবর্তন দেখাতে চান?
নুরুল হক নুর : মানুষ অভিযোগ করবে না এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই। অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনতে চাই এ ছাড়া যে সকল সাধারণ মানুষ দেশের বাহিরে যাচ্ছেন তাদের জন্য কিছু একটা করতে চাই। সেটা হচ্ছে চিকিৎসা, অথবা দেশে আসলে তাদের পাশে থাকা, এছাড়া তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করতে পারি এমন পরিকল্পনা রয়েছে।
এনপিবি নিউজ : প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
নুরুল হক নুর : যারা প্রবাসে রয়েছেন তারা বাংলাদেশের ব্র্যান্ড। আপনি ওখানে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। অনুরোধ থাকবে দেশের সুনামটা যেন বৃদ্ধি পায়, জাতি হিসেবে যেন আমরা গর্ব করে বলতে পারি আমরা বাংলাদেশি। সেভাবে আপনারা কাজ করবেন সংশ্লিষ্ট দেশের আইন কানুন বিধি বিধান মেনে চলবেন। আপনারা ভালো থাকলে আমাদের ভালো লাগবে।
এনপিবি নিউজ : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নুরুল হক নুর : এনপিবি নিউজকেও ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন