

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চীন সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধিদলের বিদায়ের সময় নজিরবিহীন ও নাটকীয় এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বেইজিং ত্যাগের মুহূর্তে কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল প্রয়োগ করে মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা চীন থেকে প্রাপ্ত সব ধরনের সামগ্রী বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
শুক্রবার (১৫ মে) বেইজিং বিমানবন্দরে এই নির্দেশনা কার্যকর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, উড়োজাহাজে ওঠার ঠিক আগে বিমানের সিঁড়ির গোড়ায় অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রেস পাস, পিন, এমনকি চীন সরকারের দেওয়া সাময়িক ব্যবহারের মোবাইল ফোন বা ‘বার্নার ফোন’সহ সব সামগ্রী সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিকভাবে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে এবং সম্ভাব্য নজরদারি বা সাইবার হুমকি প্রতিরোধের অংশ হিসেবেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদেশ সফরে প্রাপ্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা অন্যান্য সামগ্রীতে নজরদারি প্রযুক্তি থাকার আশঙ্কা থেকে এমন প্রটোকল অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
এ ঘটনার একটি প্রত্যক্ষ বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তুলে ধরেছেন নিউইয়র্ক পোস্টের হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি এমিলি গুডিন।
তিনি উল্লেখ করেন, চীনা কর্মকর্তারা মার্কিন প্রতিনিধিদের যা কিছু দিয়েছিলেন—তা সে সাধারণ পরিচয়পত্র, কর্মীদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া বার্নার ফোন কিংবা বিশেষ পিন যাই হোক না কেন, তার সবকিছুই বিমানে ওঠার আগে সংগ্রহ করে সিঁড়ির নিচে রাখা একটি বড় ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস পুলও এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বেইজিংয়ের মাটিতে দেওয়া যেকোনো উপহার বা সামগ্রীর মাধ্যমে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি করা হতে পারে, এমন গভীর সন্দেহ থেকেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরার সামনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে অত্যন্ত আন্তরিক মেজাজে দেখা গেলেও পর্দার আড়ালে দুই দেশের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যম দলগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ।
বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক টেম্পল অব হ্যাভেনে দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের একপর্যায়ে মার্কিন সাংবাদিকদের সঙ্গে থাকা সিক্রেট সার্ভিসের একজন সশস্ত্র এজেন্টকে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয় চীনা নিরাপত্তা কর্মীরা। তার সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুযায়ী সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের অস্ত্র বহন করা একটি অত্যন্ত সাধারণ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের নিরাপত্তা দলের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ঘটে।
সফর শেষে মার্কিন প্রতিনিধিদল যখন বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিল, তখনো দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে। চীনা কর্মকর্তারা প্রথমে মার্কিন সাংবাদিকদের দলটিকে প্রেসিডেন্টের মূল গাড়িবহরে যোগ দিতে সম্পূর্ণ বাধা প্রদান করেন। মার্কিন গণমাধ্যম ‘দ্য হিল’ সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে থাকা মার্কিন সহকারীরা শেষ পর্যন্ত চীনাদের তৈরি করা কঠোর নিরাপত্তা বলয় ও বাধা ভেদ করে সাংবাদিকদের জোরপূর্বক ভেতরে নিয়ে যান। চীনের মাটিতে মার্কিন গণমাধ্যমকে এভাবে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা দুই দেশের শীতল সম্পর্কের বাস্তব চিত্রকে আরও একবার ফুটিয়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের চীন সফরের সময় এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা এবারই প্রথম নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের এক পুরোনো প্রতিবেদন মনে করিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন চীনের হাংঝৌ সফরে গিয়েছিলেন, তখন শি জিনপিং'এর সঙ্গে ওবামার বৈঠকে ঠিক কতজন মার্কিন নাগরিক বা কর্মকর্তা অংশ নিতে পারবেন, তা নিয়ে মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তাদের মধ্যে বিমানবন্দরের রানওয়েতেই তীব্র বাদানুবাদ ও বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল।
ফলে এবারের ট্রাম্পের সফরে চীনা সামগ্রী ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার ঘটনাকে বেইজিংয়ের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অবিশ্বাসেরই একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: দ্য ইকোনোমিক টাইমস