বৃহস্পতিবার
১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এবার ‘সমুদ্রচুরি’র খেলায় চীন

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

দক্ষিণ চীন সাগরে একাধিক কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করেছে বেজিং। বর্তমানে সেগুলিকে আয়তনে আরও বড় করার মেগা প্রকল্পে হাত দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই নিয়ে আসিয়ান-ভুক্ত দেশগুলির সঙ্গে বাড়ছে বিরোধ।

প্রথমে লাগাতার বালি ফেলে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ। তার পর সুযোগ বুঝে সেখানে সামরিক ঘাঁটি তৈরি। আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই কায়দায় ‘সমুদ্রচুরি’তে হাত পাকাচ্ছে চীন!

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, প্রাথমিক ভাবে দক্ষিণ চীন সাগরকে পাখির চোখ করেছে বেজিং। সেখানে ষোলো আনা সাফল্য এলে ড্রাগনের নিশানায় যে পীতসাগর চলে আসবে, তা বলাই বাহুল্য। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে সাবেক ফরমোজা তথা তাইওয়ান ও জাপানের।

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক দশক আগে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় কৃত্রিম দ্বীপ তৈরির কাজ শুরু করে চীন। সরকারি ভাবে সেই প্রকল্প শেষ করার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাতে লাগাম টানেনি বেজিং।

সম্প্রতি একাধিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে ড্রাগনের ওই কুকীর্তি ফাঁস করে ‘এশিয়া মেরিটাইম ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভ’ (এএমটিআই) নামের গবেষণা সংস্থা।

তাদের দাবি, স্ট্র্যাটলি ও প্যারাসেলস দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে গজিয়ে উঠেছে একাধিক কৃত্রিম দ্বীপ, যেগুলি তৈরিতে আছে মান্দারিন নৌবাহিনীর হাতযশ।

এএমটিআই-এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ চীন সাগরের ওই এলাকায় কৃত্রিম দ্বীপের সংখ্যা বাড়াতে প্রথমে সামুদ্রিক খাঁড়ি দখল করে ড্রাগন। তার পর কৌশলগত অবস্থান বুঝে নিয়ে নির্মাণকাজে হাত লাগায়। বর্তমানে প্রায় প্রতিটা কৃত্রিম দ্বীপেই মোতায়েন আছে চীনের ‘পিপল্‌স লিবারেশন অফ আর্মি’ বা পিএলএ নৌসেনা। কিছু কিছু দ্বীপে আবার যুদ্ধবিমানের ওঠানামার জন্য বিমানঘাঁটিও তৈরি করেছে তারা। উপগ্রহচিত্রে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

উদাহরণ হিসাবে প্যারাসেলসের অন্তর্গত ট্রি দ্বীপটির কথা বলা যেতে পারে। সমুদ্রের বুকে প্রায় ২৫ একর জমি জুড়ে গড়ে উঠেছে ওই দ্বীপ, যাতে আছে একটি বন্দর, একটি হেলিপ্যাড, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, রেডার স্টেশন এবং অন্যান্য সামরিক সুযোগ-সুবিধা।

এ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কৃত্রিম দ্বীপে একটি বায়ু টারবাইন এবং সিমেন্টের কারখানা রেখেছে চীন। ফলে সেখানে আরও কিছু নির্মাণকাজ হতে পারে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

প্যারাসেলস দ্বীপপুঞ্জে নৌ ও বিমানবাহিনী মিলিয়ে চীনা পিএলএ-র অন্তত ২০টি ঘাঁটি রয়েছে। ট্রি-র অদূরে নর্থ আইল্যান্ড নামের আর একটি কৃত্রিম দ্বীপ আছে বেজিঙের। বর্তমানে সেটিকে আয়তনে বাড়ানোর চেষ্টা করছে ড্রাগন সরকার। আর তাই ২০১৬ সাল থেকে দ্বীপটির আশপাশের সমুদ্রে বালি ফেলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। নর্থ আইল্যান্ডে মান্দারিনভাষীদের একটি প্রশাসনিক ভবনও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটিকে মিডল আইল্যান্ডের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে চিনা ইঞ্জিনিয়ারদের।

অতীতে নর্থ ও মিডল আইল্যান্ডের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করেছিল বেজিং। কিন্তু সামুদ্রিক ঝড়ে তা ভেসে যায়। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ওই দুই দ্বীপের মধ্যে। তাদের মধ্যে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে আর সেতুনির্মাণের দিকে হাঁটছে না চীন। তবে দুই দ্বীপের মধ্যবর্তী সমুদ্রকে জোড়ার কাজ একেবারেই সহজ নয়। এর জন্য ড্রাগনকে আরও ১০-১২ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন সাবেক সেনাকর্তারা।

মূল প্যারাসেলস দ্বীপের সামরিক পরিকাঠামোও ঢেলে সাজিয়েছে চীন। বর্তমানে সেখানে আছে ২,৭০০ মিটার লম্বা রানওয়ে, লড়াকু জেটের হ্যাঙ্গার এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম)। ২০১৭ সালের মার্চে পাওয়া একটি উপগ্রহচিত্রে সেখানে শেনিয়াং জে-১১ যুদ্ধবিমান নিয়ে ড্রাগন বায়ুসেনাকে কসরত করতে দেখা গিয়েছিল। প্যারাসেলসের দু’টি বন্দরে রণতরীর পাশাপাশি মালবাহী জাহাজেও মাঝেমধ্যেই নোঙর করে মান্দারিনভাষীরা।

‘এশিয়া মেরিটাইম ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভ’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ চিন সাগরের আরও দক্ষিণে বেজিঙের সবচেয়ে উন্নত কৃত্রিম দ্বীপগুলি আছে স্প্র্যাটলিতে। সেখানে লড়াকু জেটের জন্য তিন হাজার মিটার লম্বা রানওয়ে তৈরি করেছে ড্রাগন। সংশ্লিষ্ট কৃত্রিম দ্বীপগুলিতে আছে স্থায়ী সেনা ব্যারাক, জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্র, রেডার স্টেশন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ইউনিট। ফলে সেখানে যে বেশি পরিমাণে পিএলও সৈনিক মোতায়েন আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

প্যারাসেলস দ্বীপপুঞ্জের পাম ও ডানকান দ্বীপকে একটি সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করেছে চীন। ওই এলাকায় বেজিঙের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাঁটি আছে বললে অত্যুক্তি হবে না। সংশ্লিষ্ট কৃত্রিম দ্বীপ দু’টিকে ডুবোজাহাজ ধ্বংসকারী যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করতে পারবে বেজিং।

এছাড়াও আছে আটটি হ্যালিপ্যাড এবং লড়াকু জেটের হ্যাঙ্গার। সামরিক ও বেসামরিক কাজের জন্য আয়তনে ছোট একটি সমুদ্রবন্দরও সেখানে রেখেছে চিন।

এছাড়া ভিয়েতনামের উপকূলের কাছাকাছি আরও কয়েকটা কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করেছে চীন। সেগুলির নাম ট্রাইটন, প্যাটন, মানি ও লিঙ্কন। ২০১৬ সালের পর সংশ্লিষ্ট দ্বীপগুলিতে যাবতীয় পরিকাঠামো তৈরির কাজ বন্ধ রেখেছিল ড্রাগন। সাম্প্রতিক সময়ের উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী, ফের সেখানে সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণে গতি এনেছে বেজিং। এর মধ্যে আছে নতুন নতুন হেলিপ্যাড নির্মাণ এবং নৌঘাঁটির সম্প্রসারণ।

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় কৃত্রিম দ্বীপগুলিকে ঘিরে ড্রাগনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে আমেরিকা। গত বছরের ডিসেম্বরে এ ব্যাপারে মুখ খোলে ইউএস-চায়না ইকোনমি অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন। তাদের দাবি, ২০১৩-’১৫ সালের মধ্যে কৃত্রিম দ্বীপগুলির আয়তন অন্তত ১২ বর্গকিলোমিটার বাড়িয়েছে বেজিং। ফলে গত ৪০ বছরের মধ্যে ওই এলাকার সমুদ্রের একটা বিশাল অংশ মান্দারিনভাষীরা গ্রাস করতে পেরেছে বলা যেতে পারে।

তবে যে পদ্ধতিতে কৃত্রিম দ্বীপগুলির আয়তন চীন বৃদ্ধি করছে, তাতে আপত্তি আছে আসিয়ান (অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস) গোষ্ঠীভুক্ত দেশের।

এ ব্যাপারে সর্বাধিক সোচ্চার হয়েছে ভিয়েতনাম। তাদের অভিযোগ, ‘সমুদ্রচুরি’ করে একটু একটু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির তটভূমির দিকে এগিয়ে আসছে বেজিং। এর সাহায্যে সমুদ্রের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জ়োনের (ইইজ়েড) আয়তন বাড়িয়ে নিচ্ছে ড্রাগন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে কোনও দেশের উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকা হল তার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা ইইজেড, খোলা রাস্তায় যেটা প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার। এই ইইজেডের যাবতীয় সামুদ্রিক সম্পদ ভোগ করে সংশ্লিষ্ট দেশটির সরকার। সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, সেই কারণেই কৃত্রিম দ্বীপকে আয়তনে বাড়িয়ে অন্যের ইইজেডে ঢুকে পড়তে চাইছে বেজিং। গোটা দক্ষিণ চিন সাগরের নিয়ন্ত্রণ বরাবরই নিজেদের হাতে রাখতে চেয়েছে তারা।

২০১৭ সালে ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় আসিয়ান-ভুক্ত দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে এই নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা চরমে ওঠে। সে বছর কোনও যৌথ বিবৃতি পাশ করতে পারেনি ওই সংগঠন। পরবর্তী সময়ে এই নিয়ে পাল্টা সুর চড়ায় বেজিং। বিবৃতি দিয়ে ড্রাগন বলে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করেছে তারা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে সেগুলিকে রক্ষা করতে নতুন করে কিছু পরিকাঠামোগত কাজ করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য অন্যের ইইজ়েডে ঢুকে যাওয়া নয়।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Czechia VS South Africa
Scheduled
18 Jun, 10:00 PM
VS
World Cup