সোমবার
২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বদলে যাচ্ছে পুরো এশিয়া

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাধারণত দেশবাসীর কাছে যে আহ্বান জানান, তা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে অনুসরণ করা হয়। করোনাভাইরাস মহামারির সময় তিনি জনগণকে ঘরে থাকতে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সমর্থন জানাতে থালা-বাসন বাজানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন লাখো ভারতীয় সেই কর্মসূচিতে অংশ নেয়।

সম্প্রতি ১০ মে দেওয়া এক বক্তব্যে মোদি আবারও নাগরিকদের সংযমী জীবনযাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যাদের পক্ষে সম্ভব তারা যেন আবারও ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ পদ্ধতিতে ফিরে যায় এবং অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ কমিয়ে আনে।

মোদি বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস আমদানিতে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হওয়ায় জনগণকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কারণেই এই আহ্বান জানায় ভারত সরকার। ভারতের পাশাপাশি এশিয়ার আরও অনেক দেশও এখন নাগরিকদের ব্যয় কমাতে বলছে। থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো শুরুতেই জ্বালানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এখন সেগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্রবেশ করেছে। যুদ্ধের প্রভাব অঞ্চলটির অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ওলটপালট করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো যেসব দেশে জ্বালানির দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে দাম হু হু করে বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে, ইন্দোনেশিয়ার হাতে মাত্র তিন সপ্তাহের জ্বালানি মজুত রয়েছে। ভিয়েতনামের মজুত এক মাসেরও কম।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান ও বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। গ্রামীণ এলাকার অনেক পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাত ২টায় ঘুম থেকে উঠি, অনেক সময় ২ লিটার ডিজেল পেতে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।’

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, কৃষিখাতে সংকট কতটা গভীর হয়েছে। ডিজেলের পাশাপাশি কৃষকরা এখন সারের সংকটেও পড়েছেন। ইউরিয়ার দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এই সারটির বড় অংশই উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত হয়।

এশিয়ার লাখ লাখ ধানচাষি এরই মধ্যে ধান রোপণ শুরু করলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকে পরিকল্পনা কমিয়ে দিচ্ছেন।

ফিলিপাইনের ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিউটের গবেষক ড. আলিশের মিরজাবায়েভ বলেন, ‘এই মুহূর্তে চাল উৎপাদন লাভজনকতার সংকটে আছে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এটি খাদ্যনিরাপত্তার সংকটে পরিণত হবে। ‘

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। শিল্পমালিকরা বলছেন, ডিজেল ও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক রংয়ের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

একটি শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক কারখানা উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

জাপানের খাদ্যপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ক্যালবি ন্যাফথার মূল্যবৃদ্ধির কারণে এখন কালো-সাদা প্যাকেট ব্যবহার শুরু করেছে, যাতে খরচ কমানো যায়। ন্যাফথা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা একটি পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল।

ন্যাফথার ঘাটতির কারণে এশিয়ার কয়েকটি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে।

ফিলিপাইনে এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে, যা মহামারির পর সর্বনিম্ন।

জাতিসংঘের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিউট বলছে, চলতি বছর ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি সরকারগুলোর আর্থিক অবস্থাকেও চাপে ফেলছে।

ভারতে জ্বালানির দাম স্থির রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। রোপণ মৌসুমে সার ভর্তুকিতে আরও প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন বা ৪৩০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি ডলার জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে থাকলে এশিয়ার সরকারগুলোর বছরে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ ভর্তুকিতে ব্যয় হতে পারে।

তবে এভাবে দীর্ঘদিন টিকে থাকা কঠিন। ভারতে কৃষকরা এখনো সরকারের কাছ থেকে সারের ভর্তুকি প্রত্যাশা করছেন, যদিও মোদি সরকার সারের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে কৃষি সংস্কারের চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তিনি।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মূল্যবৃদ্ধি এমন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যেটি ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার সরকার পতনের কারণ হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি’র তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াতেও বহু বিক্ষোভ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারগুলো শুধু জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বলছে না, বিকল্প উৎসও খুঁজছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও থাকতে পারে।

থাইল্যান্ড এখন ব্রাজিল ও লিবিয়ার মতো দেশ থেকে বেশি তেল কিনছে। অনেক এশীয় দেশ জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুরের মতো কিছু দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করছে।

তবে এ পরিবর্তনে যে শুধুই ক্ষতি হচ্ছে তা না; লাভবানও হচ্ছে কিছু দেশ। প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার বড় রপ্তানিকারক অস্ট্রেলিয়া এখন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়াচ্ছে ও বিনিময়ে নিজের প্রাকৃতিক সম্পদ বেশি রপ্তানি করছে। দেশটি ব্রুনেই, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিও করেছে।

আরেক সম্ভাব্য লাভবান দেশ চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও চীনের বিশাল তেল মজুত রয়েছে। ফলে তাদের হাতে শক্তিশালী কৌশলগত ও কূটনৈতিক সুবিধা রয়েছে।

চীন শুধু সৌর প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন বেশি বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে না, জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করছে। এই মাসে চীন কিছু পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল বিদেশে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এই রপ্তানি সীমিত করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম চালানগুলো ভিয়েতনাম ও লাওসে যাচ্ছে, যাদের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক রয়েছে। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও এখন চীনের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। গত ২৯ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বেইজিং সফরে গিয়ে জেট ফুয়েল সরবরাহের একটি চুক্তি নিশ্চিত করেন।

একই সঙ্গে এশিয়ার অনেক দেশ এখন পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগও দেখছে। সম্প্রতি ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা যৌথ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

আর ৩ মে এসিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ২০৩৫ সালের মধ্যে এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিড সংযুক্ত করতে ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে জ্বালানির দাম কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে।।

দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভাগাভাগি করতে অনাগ্রহী ছিল। প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও ছিল তাদের।

কিন্তু এখন হাজার হাজার মাইল দূরের সংঘাতের কাছে যখন তারা জিম্মি হয়ে পড়েছে, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পুরোনো বিরোধ আর আগের মতো বড় হুমকি মনে হচ্ছে না।

সোর্স: দ্য ইকোনমিস্ট

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন