বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রয়টার্সের প্রতিবেদন

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯-এ পৌঁছেছে। একই সময়ে রোগীর সংখ্যা, হাসপাতালে শয্যা সংকট ও চিকিৎসা-সামগ্রীর ঘাটতিতে হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে চরম চাপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটার পর থেকেই এ পরিস্থিতির তৈরি হয়। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটে থাকা তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত টিকাদানে বাদ পড়া এবং টিকার সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের সংক্রমণ। হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯। এ ছাড়া ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

টিকাদানে ঘাটতিই বড় কারণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মসূচির দুর্বল তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টিকা কেনার নীতিতে পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে টিকার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় এবং বহু শিশু হাম থেকে সুরক্ষাবঞ্চিত থাকে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন এক সংসদে বলেন, টিকা কেনার নীতিতে পরিবর্তনের কারণে সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান বাতিল করায় আরও বেশি শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান সূচকে বিঘ্ন ঘটাকে প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রোগের বিস্তারের প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

হাম নির্মূলের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। গত এক দশকের বেশির ভাগ সময় দেশে হাম টিকার আওতা ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা কমে যাওয়া ছাড়া এই হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পর্যায়ের কাছাকাছিই ছিল।

মহামারি বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার কারণেই বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, বাংলাদেশে এর আগে হাম আক্রান্ত হয়ে এত শিশুর মৃত্যু হয়নি। এক বছরে এত বেশি রোগীও আমরা কখনো দেখিনি। পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু।’

প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি পূরণ, টিকার আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান।

চাপে পড়ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

হাম রোগীর চাপের পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১ হাজার ৫৭১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এটি চলতি বছরে এক দিনে মৃত্যু ও ভর্তি, উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ।

ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, ‘রোগী আসছেই। সবাইকে জায়গা দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি জানান, হাসপাতালটিতে হাম রোগীদের জন্য বর্তমানে ৬০টি শয্যা রয়েছে। তবে এর পরও অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাম রোগের উপসর্গ কমাতে সহায়ক শিশুদের স্যালাইনের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এক হাজার ৩৫০ রোগীর জন্য নির্মিত হাসপাতালটিতে বর্তমানে দুই হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

পরিবারগুলোর জন্য এই প্রাদুর্ভাব মানে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, বারবার হাসপাতালে ছুটে যাওয়া এবং চিকিৎসার বাড়তি খরচ।

৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জানান, প্রায় দুই মাস আগে তার ১৩ মাস বয়সী ছেলে হাম আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত একটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। ১০ দিন পর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও এখনও তার বারবার জ্বর আসছে এবং সে পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

নাসিমা বলেন, অসুস্থ থাকার কারণে তার ছেলে নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি। পরে তারা টিকাদান কেন্দ্রে গেলে সেখানে টিকা পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। তার বড় চার সন্তান অবশ্য নিয়মিত টিকা পেয়েছে।

কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপন জানান, তার আট মাস বয়সী মেয়েকে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার কয়েক দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি ও হামসদৃশ অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর পরিবারের সদস্যরা একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ছুটলেও সঠিক তথ্য না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিশেষায়িত হাম হাসপাতালে যান।

রিপন বলেন, ‘আমরা শুধু এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছি। সঠিক কোনো তথ্যই পাচ্ছি না।’

জরুরি টিকাদানেও ঝুঁকি কাটেনি

বাংলাদেশের জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশু। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরে এক কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ ক্যাচ-আপ কর্মসূচি চালানো প্রয়োজন।

হাম ও মশাবাহিত ডেঙ্গুর এই জোড়া সংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে। এর মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ মোকাবিলার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত কার্যক্রম সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি এ রোগের প্রধান লক্ষণ। তবে দুটি ডোজ টিকা নিলে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank