

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বিশ্বকাপ কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়। প্রতি চার বছর পরপর এটি ফুটবল ইতিহাসের নতুন গল্প লেখে, আবার কিছু গল্পের শেষ পাতাটিও উল্টে দেয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সেই অনুভূতিই সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করছে ফুটবলপ্রেমীদের। কারণ, যে প্রজন্মকে ঘিরে গত দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবল আবর্তিত হয়েছে, সেই প্রজন্মের সূর্য এখন পশ্চিম আকাশে।
একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল লিওনেল মেসির জাদুকরি ড্রিবল, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গোলের ক্ষুধা, লুকা মদ্রিচের নিখুঁত পাস কিংবা নেইমারের সৃজনশীলতা। প্রতিটি আসরে তাদের ঘিরেই তৈরি হতো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সময়ের নিয়ম বড় নির্মম। বয়স, ফিটনেস ও ক্যারিয়ারের স্বাভাবিক পরিণতির কারণে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে তাদের অনেককেই হয়তো আর দেখা যাবে না।
ফলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে অনেকেই দেখছেন একটি যুগের শেষ অধ্যায় হিসেবে। এটি শুধু একটি টুর্নামেন্টের সমাপ্তি নয়, বরং আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত প্রজন্মের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ।
এমন অবস্থায় মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অবিনশ্বর গানের কথাগুলো:
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে...
মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ সালের আসরেও তিনি দলের ভরসার প্রতীক ছিলেন। তবে ৩৯ বছর বয়সে এসে পরবর্তী বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। যদিও অবসর নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, তবু ফুটবলবিশ্ব ধরে নিচ্ছে—বিশ্বকাপে মেসির অধ্যায় হয়তো শেষ।
রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ
পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে ষষ্ঠবার অংশ নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন এই ফরোয়ার্ড ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা রোনালদো বিদায় নিলে শেষ হবে ফুটবলের অন্যতম সেরা এক অধ্যায়ও।
নেইমারের শেষ লড়াই?
ইনজুরি পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই নেইমারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। তবু ব্রাজিলের হয়ে শেষবারের মতো বিশ্বকাপে নিজের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না দিলেও তার বক্তব্যে বিদায়ের আভাস মিলেছে।
মদ্রিচের বিদায়ঘণ্টা
ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসে লুকা মদ্রিচ এক অনন্য নাম। ৪০ বছর বয়সেও তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন একই দক্ষতায়। তবে বাস্তবতা বলছে, চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপে তাকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।
আরও যাদের বিদায় দেখা যেতে পারে
শুধু এই চারজন নন, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হয়তো শেষ হয়ে থাকবে আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ ফুটবলারের জন্য। জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ার, বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনা, মিশরের মোহামেদ সালাহ, নেদারল্যান্ডসের ভার্জিল ভ্যান ডাইক, দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউং-মিন, মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়া, আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওতামেন্দি, ব্রাজিলের কাসেমিরো এবং বসনিয়ার এদিন জেকোর মতো তারকারাও হয়তো আর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরবেন না।
প্রতিটি প্রজন্মের বিদায়ের পরই ফুটবল নতুন নায়ক খুঁজে নেয়। হয়তো আগামী বিশ্বকাপে আলো ছড়াবেন লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ কিংবা আরও নতুন কেউ। কিন্তু মেসি-রোনালদোদের যুগের সঙ্গে তুলনা করার আগে তাদেরও পেরোতে হবে দীর্ঘ পথ।
ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা চলতেই থাকবে। কিন্তু গত দুই দশককে সংজ্ঞায়িত করা এই প্রজন্মের অবদান আলাদা করেই স্মরণ করা হবে। কারণ, তারা শুধু ম্যাচ জেতাননি; কোটি মানুষের ফুটবল দেখার অভ্যাস, আবেগ আর স্মৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছেন।
