

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রত্যাবর্তনের সেই ম্যাচেই রোববার ইতিহাস গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে ৯ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
এই জয় শুধু ব্যবধানের কারণে নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও ছিল বাংলাদেশের হাতে। প্রথম ইনিংসে পেসারদের দাপট, এরপর ব্যাটারদের দৃঢ়তা এবং দ্বিতীয় ইনিংসে স্পিনারদের কার্যকর বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফিরতেই দেয়নি বাংলাদেশ।
ডারউইনের এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি টার্নিং পয়েন্ট ম্যাচের গতিপথই বদলে দেয়।
শুরুতেই হাসান মাহমুদের ঝড়
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। নিজেদের মাটিতে শুরুটা দারুণ করার প্রত্যাশা ছিল স্বাগতিকদের। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেন বাংলাদেশের পেসাররা।
সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন হাসান মাহমুদ। গতি, সুইং ও নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের শুরু থেকেই চাপে রাখেন তিনি। বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি স্বাগতিকরা।
শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। ২০০ রানের নিচে স্বাগতিকদের আটকে দেওয়া ম্যাচের প্রথম বড় টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে।
তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটে পাল্টা জবাব
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিং কেমন হবে, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের জবাব দেন তানজিদ হাসান তামিম।
টেস্ট ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্য নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে থাকা এই ওপেনার অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের বিপক্ষে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যাট করেন। কখনো আক্রমণাত্মক, আবার কখনো পরিস্থিতি অনুযায়ী ধৈর্য ধরে ইনিংস এগিয়ে নেন।
এরপর তুলে নেন সেঞ্চুরি। তানজিদের এই ইনিংস বাংলাদেশের স্কোর বড় করার পাশাপাশি দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের বড় লিড পায় তারা। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে।
৭৬ বলের প্রতিরোধ
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের বড় লিডের পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার চেষ্টা করে তারা।
কিন্তু সেই চাপ সামলে নেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের ৭৬ বলের প্রতিরোধ অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যাশিত গতি আটকে দেয়।
প্রয়োজনের সময় উইকেট ধরে রেখে বাংলাদেশের লিড আরও বড় করার পথ তৈরি হয়। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা যতই চাপ তৈরি করার চেষ্টা করেছে, বাংলাদেশ ততই ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামলেছে।
এই প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াকে বড় লক্ষ্য থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মিরাজের পাঁচ উইকেটে শেষ ধাক্কা
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের পেসাররা চাপ তৈরি করার পর সেই চাপকে চূড়ান্ত সাফল্যে রূপ দেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
বিশেষ করে নিচের সারির ব্যাটারদের একের পর এক ফিরিয়ে দিয়ে পাঁচ উইকেট তুলে নেন তিনি। মিরাজের বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারও দাঁড়াতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে এমন এক অবস্থায়, যেখান থেকে বাংলাদেশের জয় কার্যত সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ১৩ রান।
চাপ ধরে রাখার মানসিকতা
ডারউইনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো কোনো একটি উইকেট বা একটি ইনিংস নয়, বরং পুরো ম্যাচে চাপ ধরে রাখার মানসিকতা।
অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ভালো শুরু করেও ম্যাচের মাঝপথে নিয়ন্ত্রণ হারানোর নজির বাংলাদেশের ক্রিকেটে কম নেই। কিন্তু ডারউইনে সেই চিত্র ছিল ভিন্ন।
প্রথম ইনিংসে কম রানে অস্ট্রেলিয়াকে আটকে দেওয়ার পর ব্যাট হাতে বড় লিড নেয় বাংলাদেশ। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসেও বোলাররা একইভাবে ধৈর্য ধরে চাপ তৈরি করেন। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ফেরার কোনো সুযোগ তৈরি করলেই বাংলাদেশ সেটি নষ্ট করে দেয়।
ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও স্বীকার করেন, বাংলাদেশ সব বিভাগেই তাদের চেয়ে ভালো খেলেছে।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় ইতিহাস
শেষ পর্যন্ত মাত্র এক উইকেট হারিয়ে ১৩ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। নিশ্চিত হয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়ে তাদেরই হারানো—তাও ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে—বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন হয়ে থাকল।
হাসান মাহমুদের শুরু, তানজিদের সেঞ্চুরি, হাসান মাহমুদের প্রতিরোধ, মিরাজের পাঁচ উইকেট এবং পুরো ম্যাচে চাপ ধরে রাখার মানসিকতা—এই পাঁচ টার্নিং পয়েন্টেই ডারউইনে লেখা হলো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়।


