


রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। তবে দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য।
এতে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ বেডরুমের খাটের পাশে পাওয়া যায়নি। তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয় নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ থেকে। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা ও মেয়ে প্রার্থীর মরদেহ পাওয়া যায় ছাদে ওঠার সিঁড়ির আগের অংশে থাকা ছাদঘরে। আর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় দ্বিতীয় তলার একটি শয়নকক্ষে খাটের পাশের অংশে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে তালাবদ্ধ ওই বাসা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৩)।
‘Basu Bappaditya’ নামে একটি ফেসবুকে প্রোফাইল থেকে দাবি করা হচ্ছে, ‘‘পুলিশ বললো, গণপতি স্যার খুন হয়েছেন ছাদে। তাঁর মরদেহ ছাদেই পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রাপ্ত ছবি ও ভিডিওতে দেখছি, স্যারের মুখবাঁধা রক্তে ভেসে যাওয়া মরদেহ ছিলো বেডরুমে খাটের ঠিক পাশেই মেঝেতে। মা-মেয়ের মরদেহও ছিলো ঘরে।’’
পোস্টের কমেন্টে একটি কক্ষের খাটের পাশে মুখে লাল গামছা বাঁধা একটি লাশের ভিডিও যুক্ত করা হয়েছে। পোস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামীলীগের অনুসারীরাসহ অনেকেই এমন তথ্য ছড়িয়েছেন।
তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, সাবেক শিক্ষক গণপতির লাশ বেডরুমের খাটের পাশে থেকে নয়। বরং ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আর তার স্ত্রী ও মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ছাদে উঠার সিঁড়ির পাশে। অর্থাৎ ছাদঘরে। এছাড়া পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের লাশ পাওয়া গেছে দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে।
এছাড়া গণপতির নামে ছড়ানো ভিডিওটি মূলত তার ছেলে আয়ুশের।
ঘটনাস্থলে কী পাওয়া গিয়েছিল
নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থল থেকে করা একাধিক লাইভ ভিডিও পর্যালোচনায় মরদেহ উদ্ধারের স্থান সম্পর্কে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
রংপুরের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডিআরবি নিউজের লাইভে দেখা যায়, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তালা ভেঙে বাসায় প্রবেশ করার পর ভেতরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান। ডাইনিং স্পেসে আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল এবং ফ্রিজও খোলা ছিল।
এরপর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ছাদের দিকে গেলে সিঁড়ির কাছে দুটি মরদেহ দেখতে পান। ওই লাইভে প্রতিবেদককে বলতে শোনা যায়, ছাদে ওঠার সিঁড়ির অংশে দুটি নারীর মরদেহ পড়ে আছে। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এগুলো ছিল গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা এবং মেয়ে প্রার্থীর মরদেহ।
ডিআরবি নিউজের আরেকটি লাইভেও বলা হয়, গণপতির স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদে ওঠার অংশে পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে গণপতির মরদেহ ছাদের একটি কোণায় এবং ছেলে আয়ুশের মরদেহ একটি শয়নকক্ষের খাটের নিচে পাওয়া যাওয়ার কথা জানানো হয়।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ডিআরবি নিউজের আরেকটি লাইভে গণপতির মরদেহ যে জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেই স্থানও দেখানো হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার বসবাস করত। দ্বিতীয় তলার একটি শয়নকক্ষের খাটের পাশে আয়ুশের মরদেহ পাওয়া যায়। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও প্রার্থীর মরদেহ। আর তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ।
বিডিনিউজের একটি প্রতিবেদনের শিরোনামও ছিল, ‘রংপুরে ৪ খুন: শিক্ষক পরিবারের লাশ পড়েছিল ছাদে-সিঁড়িতে-ঘরে’।
তবে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে পুলিশকে উদ্ধৃত করে মরদেহগুলোর অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ভিন্ন বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে গণপতি ও তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতার মরদেহ দোতলার সিঁড়ির কাছে এবং প্রার্থীর মরদেহও সেখানে থাকার কথা বলা হয়। আয়ুশের মরদেহ একটি কক্ষের খাটের নিচে পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতদের স্বজন বিপুল আচার্যের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিবরণে গণপতির মরদেহ ছাদের একটি কোণায় পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
স্বজনের বক্তব্যেও একই তথ্য
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোনের স্বামী বিপুল আচার্য প্রথমে থানায় গিয়ে পুলিশকে খবর দেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস এসে তালা ভেঙে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। তখন ঘরের কাপড়চোপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখা যায়। ফ্রিজ খোলা ছিল এবং বিভিন্ন জিনিস বাইরে ছড়িয়ে ছিল।
ঘরের ভেতরে প্রথমে কাউকে না পেয়ে তারা ছাদের দিকে যান। বিপুল আচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে ওঠার আগের সিঁড়ির অংশে তাঁর শ্যালিকা প্রীতিলতা ও তাঁর মেয়ের মরদেহ পড়ে ছিল।
পরে ছাদের একটি কোণায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ এবং অন্য একটি ঘরে খাটের নিচে আয়ুশের মরদেহ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
বিপুল আচার্য আরও জানান, ভবনটির দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার ছাড়া আর কোনো ভাড়াটিয়া ছিল না। নিচতলাটি তখনও বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআরবি নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও এটিএন বাংলার রংপুর জেলা প্রতিনিধি শাহরিয়ার মিম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘আমি শুরু থেকেই পুরো সময় ঘটনাস্থলে ছিলাম। বাসাটিতে তিনটি কক্ষ। গণপতি স্যারের লাশ ছাদের এক কোনায় পাওয়া গিয়েছিল। স্যারের স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে ওঠার আগে যে ঘরের মতো একটা থাকে, সেখানে সিঁড়িতে পরে ছিল। আর স্যারের ছেলের লাশ পাওয়া গেছে একটি ঘরের খাটের নিচে। স্যারের ছেলেকে পাওয়া গেছিল একটি রুমের খাটের নিচ থেকে।’’
ডিবিসি টেলিভিশনের একটি লাইভেও ঘটনাস্থলের পাশের ভবন থেকে গণপতির মরদেহ দেখা যাওয়ার কথা জানানো হয়। ডিবিসির সিনিয়র রিপোর্টার ও রংপুর ব্যুরো প্রধান মাজেদ মাসুদ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, পাশের ভবনের ছাদ থেকে একটি মরদেহ দেখা যাচ্ছিল, তবে দূরত্বের কারণে সেটি গণপতির মরদেহ কি না তখন নিশ্চিতভাবে বোঝা সম্ভব হয়নি।
ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধের সম্ভাবনার কথা
রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, চারটি মরদেহই ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। তাঁর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে শ্বাসরোধ করে হত্যার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, সিআইডির পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। সিআইডি ল্যাবের রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।
মুখে রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মরদেহ পচে যাওয়ার কারণে এমনটি মনে হতে পারে। অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের স্পষ্ট চিহ্ন তাঁরা পাননি।
হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকারীদের মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তাঁর গলা পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় শব্দ পেয়ে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে এলে তাঁকেও একইভাবে হত্যা করা হয়।
তবে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ ঘটনা, অন্য দুই সদস্যের মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং কারা এতে জড়িত এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খাটের পাশে মুখ বাঁধা মরদেহের ভিডিওটি এই হত্যাকাণ্ডের নয়। একই সঙ্গে গণপতির মরদেহ বেডরুমে খাটের পাশে পাওয়া গেছে এ দাবিটিও সঠিক নয়। ঘটনাস্থলের ভিডিও, স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় তাঁর মরদেহ ছাদ থেকে এবং স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদে ওঠার আগের সিঁড়ির অংশ থেকে উদ্ধার হওয়ার তথ্যই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আয়ুশের মরদেহ পাওয়া যায় দ্বিতীয় তলার একটি শয়নকক্ষে খাটের নিচে বা পাশে।