

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


খেলাধুলার দুনিয়ায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ‘রাইভালরি’ (Rivalry) এমন একটি বিষয়, যেখানে কেবল নিজের দলের জয়ই প্রধান নয়, বরং প্রধান প্রতিপক্ষের হারও সমান আনন্দিত করে।
যখন একটি রাইভাল টিম অন্য কোনো দলের কাছে হেরে যায়, তখন তৃতীয় কোনো রাইভাল টিম নিজেরা ম্যাচ না জিতেও কিংবা টুর্নামেন্টে না খেলেও উল্লাস প্রকাশ করে। মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং খেলাধুলার কৌশলগত দিক থেকে এই ধরনের আচরণের পেছনে গভীর কিছু সাইকোলজিকাল কারণ কাজ করে।
শ্যাডনফ্রয়ডা (Schadenfreude) বা অন্যের বিপদে আনন্দ
মনোবিজ্ঞানে অন্যের ব্যর্থতা বা দুর্ভাগে যে আনন্দ অনুভূত হয়, তাকে ‘Schadenfreude’ বলা হয়। স্পোর্টস সাইকোলজির দৃষ্টিতে, একজন সমর্থক যখন তার প্রধান প্রতিপক্ষকে হারতে দেখে, তখন তার মস্তিষ্কে ইতিবাচক হরমোন (ডোপামিন) নিঃসৃত হয়।
নিজের দলের সরাসরি কোনো অর্জন না থাকলেও, শত্রুর পতন বা ব্যর্থতা সমর্থক ও ক্লাব উভয়কেই একধরনের মানসিক স্বস্তি ও তৃপ্তি দেয়।
সামাজিক পরিচয় এবং 'ইন-গ্রুপ বনাম আউট-গ্রুপ' থিওরি
সমাজবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি’ (Social Identity Theory) অনুযায়ী, মানুষ নিজেকে একটি নির্দিষ্ট দলের (In-group) অংশ হিসেবে দেখে এবং প্রতিপক্ষকে (Out-group) নিজেদের অস্তিত্ব বা সম্মানের জন্য হুমকি মনে করে।
চিরপ্রতিদ্বন্দী দলের পরাজয় প্রতিপক্ষের অহংকার, আধিপত্য ও সমর্থকদে ট্রোল করার সুযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে, নিজেদের জয় ছাড়া হলেও প্রতিপক্ষের পরাজয়কে সামাজিক ও মানসিকভাবে নিজেদের পরোক্ষ 'সামাজিক জয়' হিসেবে গণ্য করা হয়।
পয়েন্ট টেবিল ও কৌশলগত সুবিধা (Strategic Advantage)
পেশাদার লিগ বা টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রে এই খুশি হওয়ার বিষয়টি কেবল আবেগীয় নয়, বরং বেশ হিসাব-নিকাশের। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল পয়েন্ট হারালে টুর্নামেন্টের পয়েন্ট টেবিলে সমীকরণ বদলে যায়।
রাইভাল টিমের রেটিং, শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা বা কোয়ালিফিকেশনের রাস্তা কঠিন হয়ে পড়লে অন্য দলটির সুযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়।
ফলে সরাসরি ম্যাচ না জিতেও লিগ টেবিলে পরোক্ষ সুবিধা লাভ করা সম্ভব হয়।
ব্র্যান্ড ভ্যালু ও ফ্যানবেস প্রেসার
আধুনিক পেশাদার খেলাধুলায় সাফল্য ও ব্যর্থতা দলের ব্র্যান্ড ভ্যালুর ওপর বড় প্রভাব ফেলে। একটি রাইভাল টিমের পরপর পরাজয় তাদের ফ্যানবেসের মধ্যে হতাশা তৈরি করে এবং স্পন্সরশিপ বা মিডিয়া অ্যাটেনশনেও প্রভাব ফেলে।
প্রতিপক্ষ দলের এই সাময়িক দুর্বলতা বা অস্থিরতা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোকে বাজারে ও গণমাধ্যমে বেশি মনোযোগ ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়।
সমর্থকদের কালচারাল ট্রোলিং ও ব্যান্টারিং (Banter Culture)
খেলার সংস্কৃতিতে সমর্থকদের পারস্পরিক খোঁচাখুঁচি বা 'ব্যান্টারিং' অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি অনুষঙ্গ। রাইভাল টিম হেরে গেলে তাদের সমর্থক ও অফিশিয়ালদের ওপর কথা বলার নৈতিক বল থাকে না।
প্রতিপক্ষকে নিয়ে ট্রোল করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোল পোস্ট বানানো বা তাদের অহংকার ভেঙে পড়তে দেখা সমর্থকদের জন্য খেলার মাঠের জয়ের মতোই আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
রাইভাল দলের পরাজয়ে অন্য রাইভাল দলের এই আনন্দ কেবল খেলোয়াড়ি মনোভাবের অভাব নয়, বরং এটি খেলাধুলার ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন, মনস্তাত্ত্বিক আত্মতৃপ্তি এবং টুর্নামেন্টের হিসাব-নিকাশের এক জটিল ও স্বাভাবিক সংমিশ্রণ।