


যুগযুগ ধরে গ্রুপিং দ্বন্দ চলে আসছে বান্দরবান বিএনপিতে। এবার নতুন করে দ্বন্দের সৃষ্টি হয়েছে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ন্যস্ত বিভাগগুলোর দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে। অন্তর্বতী জেলা পরিষদ পুনর্গঠন হতে না হতেই ন্যস্ত বিভাগগুলোর দায়িত্ব বণ্টনকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুসরণ না করে ন্যস্ত বিভাগগুলো বণ্টন করা হয়েছে এমন অভিযোগে পার্বত্য মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী সমর্থিত ৯ পরিষদ সদস্যের।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি আইন অনুযায়ী বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা, জেলা সমাজসেবা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও মৎস্য বিভাগসহ মোট ২৮ টি ন্যস্ত বিভাগ/দপ্তর পরিচালনা ও তদারকি করে আসছে। মূলত এই ন্যস্ত বিভাগগুলো পরিষদ সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করে দায়িত্ব দেওয়া হয। এই ন্যস্ত বিভাগগুলো বণ্টন নিয়েই নতুন করে দ্বন্দের সৃষ্টি হয়েছে জেরী গ্রুপ ও মাম্যাচিং গ্রুপের মধ্যে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ন্যস্ত বিভাগগুলো দায়িত্ব বণ্টনসংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় যে প্রজ্ঞাপনটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাম্যাচিং কর্তৃক স্বাক্ষরিত।
প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জেরী গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে চরম অসন্তোষের দেখা দেয় এবং এরপর থেকে পরিষদ কার্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন এই সদস্যরা। পার্বত্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে বিক্ষোব্ধ ৯ জন সদস্যের স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগও দাখিল করেছেন।
জেলা পরিষদের প্রজ্ঞাপন মতে দেখা যায়, বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ পরিষদের চেয়ারম্যান মাম্যাচিং নিজ দায়িত্বে রাখেন এবং পরিষদ সদস্য চনুমং কে জেলা মৎস্য বিভাগ ও জেলা ক্রীড়া বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তাছাড়াও সদস্য মং ক্যনু মারমাকে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান, সদস্য লুসাইমংকে স্বাস্থ্য বিভাগ ওজেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, মাওসেতুং তংচংগ্যাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং জেলা হর্টিকালচার সেন্টার ও নার্সারীসমূহ, দনওয়াই স্রোকে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ও অন্যান্য শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান এবং জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, আগস্টিন ত্রিপুরাকে তুলা উন্নয়ন বিভাগ, অংজাই উই চাককে জেলা শিল্পকলা একাডেমী এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট, রিয়াল দাও বমকে পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সরকারি গণগ্রন্থাগার, আবদুল মাবুদকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) (এগ্রো সার্ভিস সেন্টার, সেচ, সার, বীজ বিতরণ উইং), মশিউর রহমানকে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, মোহাম্মদ জসীম উদ্দীনকে জেলা সমাজসেবা বিভাগ ও বাজারফান্ড সংস্থা, ক্যউ ক্রু খিয়াংকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, উম্যাসিংকে জেলা সমবায় বিভাগ এবং সদস্য কাজী নিরুতাজ বেগম সরকারি শিশু পরিবার বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আদেশ জারির পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জেরী গ্রুপের সদস্যদের মাঝে চরম অসন্তোষের দেখা দেয়। প্রতিবাদকারী সদস্যদের অভিযোগ, প্রচলিত জেলা পরিষদ আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া ও বৈষম্যমূলকভাবে বিভাগগুলোর দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
সাচিং প্রু জেরী গ্রুপের সদস্য মশিউর রহমান জানান, “জেলা পরিষদের আইন অনুযায়ী যে প্রক্রিয়ায় ন্যস্ত বিভাগ বণ্টন করার কথা ছিল, তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান হয়তো এটা নিজের স্বভাবে করে ফেলছে। এটা চেয়ারম্যানকে আমি এখনই দোষ দিব না, হয়তো উনি বুঝতে পারে নাই। কারণ দীর্ঘ ১৭ বছর ভালো প্র্যাকটিসগুলা হয় নাই।আমি আপনার মাধ্যমেও জেলা পরিষদের যেসব কর্মকর্তারা আছেন, সবাইকে আহ্বান করব যে, আইনের বইটা পড়ার জন্য জেলা পরিষদের। আমরা চাই আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদটা চলুক।
এ সদস্য আরো জানান, বিভাগগুলো বণ্টনের আগে চেয়ারম্যানের উচিত ছিল পরিষদের সকল সদস্যদের নিয়ে সভা ডেকে সবার মতামত নেওয়া। কিন্তু তিনি তা করেননি।
জেরী গ্রুপের আরেক সদস্য আব্দুল মাবুদ বলেন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মিলেমিশে কাজ করতে চাই। কেউ যেন অগণতান্ত্রিকভাবে, একতরফাভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়। কিন্তু চেয়ারম্যান একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাদের সাথে আলোচনা ছাড়া, পরিষদের কোনো সভা-সমাবেশ ছাড়া। সুতরাং বিষয়টি পুর্নবিবেচনা করা হোক।
এদিকে অফিস আদেশ জারির পর থেকে সাচিং প্রু জেরী বলয়ের ৯ জন সদস্য টানা অফিসে না আসায় পরিষদের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজ স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হস্তান্তরিত দপ্তরগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
এ বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাম্যাচিং বলেন, আসলে ভালো ডিপার্টমেন্ট, খারাপ ডিপার্টমেন্ট বলে কি কিছু আছে? উনাদের অভিযোগ তাহলে সরকারকে গিয়ে বলুক, আমাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে ছাঁটাই-ফাঁটাই করে দিক। ওরাই বসে যাক এক একজন চেয়ারম্যানের দায়িত্বে, ওরাই বণ্টন করে নিজের মতো নিয়ে নিক। এখন বণ্টনের দায়িত্ব কি এটা চেয়ারম্যানের, নাকি সদস্যদের? যে ডিপার্টমেন্ট গুলো তাদেরকে দেওয়া হয়েছে সেগুলো যদি পছন্দ না হয় তাহলে গিয়ে সরকারকে বলুক এই ডিপার্টমেন্টগুলো উঠিয়ে ফেলুক, রাখার দরকার কি।
তিনি আরো বলেন, প্রজ্ঞাপনের নিচে লেখা আছে যে, আমি ১৮০ দিন সময় নিয়েছি। এটার মধ্যে দেখবো ওরা কে কি রকম কাজ করে, সেটা দেখে কিন্তু আমি পুনর্বণ্টন করবো দরকার মতো।
এখন ওরা যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে ওরা কিন্তু আরও পিছিয়ে গেল। এখন যেটা পেয়েছে সেটাও আর পাবে না। আমি মন্ত্রণালয়ে সরাসরি জানিয়ে দেবো ওরা কোনো কাজ করছে না। সুতরাং ওদেরকে রেখে লাভ কি।