

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


পবিত্র কোরআনের অনেক স্থানে আল্লাহ তাআলা অতীতের যেসব জাতির ইতিহাস গুরুত্বের সাথে উল্লেক করেছেন, তন্মধ্যে কওমে লুতের আলোচনা অন্যতম। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবজাতির ইতিহাসে তারাই প্রথম প্রকাশ্যে সমকামিতাকে সামাজিক আচরণে পরিণত করেছিল। আল্লাহ তাআলা তাদের সতর্ক করতে হজরত লুত আলাইহিস সালামকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নবীর কথা তো মানেই নি; উল্টো আরও বেশি অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যায়। ফলে তাদের উপর নেমে আসে আল্লাহর বিশেষ আজাব।
কওমে লূত: ইতিহাসের প্রথম সমকামি সম্প্রদায়
তাফসির ও ইসলামি ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত লূত (আ.)-এর সম্প্রদায় সাদ্দূম (সোদোম) ও এর আশপাশের জনপদে বসবাস করত। তারা শুধু সমকামিতায়ই লিপ্ত ছিল না; বরং প্রকাশ্য অশ্লীলতা, দস্যুবৃত্তি, ছিনতাই এবং বিভিন্ন সামাজিক অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছিল।
শয়তানের কুমন্ত্রণায় তারা এ বিকৃত আচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে সেটিকে স্বাভাবিক জীবনধারা হিসেবে গ্রহণ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘আর আমি লূতকে প্রেরণ করেছিলাম। যখন তিনি তার সম্প্রদায়কে বললেন, ‘তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বের কেউ কখনো করেনি। তোমরা কামপ্রবৃত্তি পূরণের জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে যাচ্ছ। বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।’ (সুরা আল-আরাফ: ৮০–৮১)
নবীর আহ্বান ও তার অসহায়ত্ব
হজরত লূত (আ.) দীর্ঘ সময় ধরে তার সম্প্রদায়কে এ পথভ্রষ্টতা থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু তারা তার দাওয়াত গ্রহণ না করে তাকে উপহাস করে এবং জনপদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘তাদের উত্তর শুধু এতটুকুই ছিল যে তারা বলল, ‘এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো নিজেদের খুব পবিত্র রাখতে চায়।’ (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ৮২)
পরবর্তীতে সুদর্শন যুবকের বেশে আগত ফেরেশতারা হজরত লূত (আ.)-এর মেহমান হিসেবে তার বাড়িতে এলে পাপাচারীরা তাদের ওপর চড়াও হতে উদ্যত হয়। তখন হজরত লূত (আ.) চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।
‘লূত বললেন, ‘হায়! তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি যদি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতাম!’ (সুরা হুদ: ৮০)
লূত (আ.)-এর স্ত্রীর ভূমিকা
হজরত লূত (আ.)-এর স্ত্রীও ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি স্বামীর প্রতি ইমান আনেননি। বরং পাপাচারীদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং ফেরেশতাদের আগমনের সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ কারণে তিনিও আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাননি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘তার স্ত্রী ছাড়া; আমি নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম যে, সে পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা আল-হিজর: ৬০)
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, পাপে সরাসরি জড়িত না হলেও পাপীদের সহযোগিতা বা সমর্থন করাও গুরুতর অপরাধ।
যেভাবে ধ্বংস হলো এই জাতি
আল্লাহর নির্দেশে হজরত লূত (আ.)-কে রাতের শেষ ভাগে পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে জনপদ ত্যাগ করতে বলা হয়। এরপর ফেরেশতারা আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
‘অবশেষে যখন আমার আদেশ এলো, তখন আমি সেই জনপদকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করলাম।’ (সুরা হুদ: ৮২)
জমহুর মুফাসসির ও বহু ঐতিহাসিকের মতে, বর্তমান জর্ডান ও ফিলিস্তিন সীমান্তবর্তী মৃত সাগর (Dead Sea) বা বাহরে লূত অঞ্চলটি ঐ ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ইসলামি ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি, মুসলিম ঐতিহ্যে অঞ্চলটি আল্লাহর শাস্তির একটি স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী
কওমে লূতের ঘটনা শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; বরং উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ের আশঙ্কা করি, তা হলো কওমে লূতের কাজ।’ (ইবনে মাজাহ: ২৫৬৩, জামে তিরমিজি ১৪৫৭)
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা, জীবন, সম্পদ ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত। একই সঙ্গে ইসলাম নৈতিক আচরণ ও পারিবারিক জীবনের জন্য সুস্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করেছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যৌন সম্পর্কের বৈধ ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়েছে বৈধ বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে।
জমহুর ফকিহদের মতে, কওমে লূতের ঘটনা কেবল একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়; বরং নৈতিক অবক্ষয়, আল্লাহর অবাধ্যতা এবং সীমালঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে মানবজাতির জন্য একটি স্থায়ী সতর্কবার্তা।
ইতিহাসের শিক্ষা, বর্তমানের দায়িত্ব
কওমে লূতের ঘটনা কুরআনের এমন একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়, যা শুধু একটি জাতির ধ্বংসের বিবরণ নয়; বরং সত্য ও অসত্য, নৈতিকতা ও সীমালঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে এক চিরন্তন শিক্ষা। নবী লূত (আ.)-এর ধৈর্য, তার অবিরাম দাওয়াত এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ন্যায়বিচারের বাস্তবায়ন প্রতিটি মুমিনকে আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যের আহ্বান জানায়।
একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, নৈতিক মূল্যবোধকে ধারণ করা এবং সমাজে শালীনতা, পবিত্রতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। একই সঙ্গে মানুষের সঙ্গে আচরণে ন্যায়, প্রজ্ঞা ও উত্তম চরিত্র বজায় রাখা ইসলামি শিক্ষারই অংশ।