বৃহস্পতিবার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্যাংকে জমানো টাকার জাকাত দেওয়ার নিয়ম

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:১৭ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ তাদের অর্থ ব্যাংকে সঞ্চয় করে রাখেন। কেউ সেভিংস অ্যাকাউন্টে, কেউ কারেন্ট অ্যাকাউন্টে, আবার কেউ ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্যান্য স্কিমে টাকা জমা রাখেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাংকে রাখা টাকা সম্পদের অন্তর্ভুক্ত এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে এর ওপর জাকাত ফরজ হয়।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, ব্যাংকে রাখা টাকার জাকাত কীভাবে হিসাব করতে হবে এবং কোন টাকার ওপর জাকাত দিতে হবে। এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

ইসলামে জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য দুটি মূল শর্ত রয়েছে। প্রথমত, সম্পদের পরিমাণ নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই সম্পদ এক পূর্ণ চন্দ্র বছর নিজের মালিকানায় থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ নিজের আপন ভাই-বোনকে কি জাকাত দেওয়া যাবে?

টাকা-পয়সার নিসাব নির্ধারিত হয়েছে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা তার সমমূল্যের অর্থ। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী রূপার মূল্য হিসাব করে দেখা হবে,

আপনার ব্যাংকে জমা টাকার পরিমাণ নিসাব ছাড়িয়েছে কি না। যদি নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি হয় এবং এক বছর পূর্ণ হয়, তাহলে জাকাত ফরজ হবে।

ব্যাংকে থাকা সব ধরনের টাকা জাকাতের আওতায় পড়ে। যেমন-

সেভিংস অ্যাকাউন্টের টাকা, কারেন্ট অ্যাকাউন্টের টাকা, ফিক্সড ডিপোজিট, ব্যবসার অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ, মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ওয়ালেটে থাকা টাকা, সবই জাকাতযোগ্য সম্পদ। কারণ এসব অর্থ আপনার মালিকানাধীন এবং প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য।

জাকাতের হার হলো মোট সম্পদের ২.৫ শতাংশ বা এক-চল্লিশ ভাগ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় ২.৫০ টাকা জাকাত দিতে হবে। হিসাব করার সময় ব্যাংকে থাকা মোট টাকার সঙ্গে হাতে থাকা নগদ অর্থ

এবং পাওনা টাকা (যা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা আছে) যোগ করে মোট সম্পদ নির্ধারণ করতে হবে। এরপর তার ২.৫ শতাংশ হিসাব করলেই জাকাতের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।

যদি কারো ব্যাংকে ২ লক্ষ টাকা থাকে এবং হাতে নগদ থাকে ৫০ হাজার টাকা, তাহলে মোট সম্পদ হবে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এর ২.৫ শতাংশ হবে ৬,২৫০ টাকা।

আরও পড়ুনঃ স্বর্ণ বা গয়নার জাকাত কীভাবে হিসাব করবেন?

এই পরিমাণটাই জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। তবে যদি কারো ওপর বৈধ ঋণ থাকে, যা পরিশোধ করা জরুরি, তাহলে সেই ঋণের পরিমাণ মোট সম্পদ থেকে বাদ দিয়ে জাকাত হিসাব করা যাবে।

ফিক্সড ডিপোজিট বা মেয়াদি সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে মূল টাকা এবং লাভ—দুয়ের ওপরই জাকাত দিতে হবে। কারণ লাভও আপনার সম্পদের অংশ হয়ে গেছে।

তবে যদি কোনো স্কিমে টাকা নির্দিষ্ট সময়ের আগে তোলা সম্ভব না হয়, তবুও মালিকানা আপনার থাকায় জাকাত আদায় করতে হবে।

সুদ বা হারাম আয় থাকলে তার জাকাত দেওয়া যাবে না। বরং সুদের টাকা আলাদা করে গরিবদের মাঝে সদকা হিসেবে দিয়ে দিতে হবে, কিন্তু এতে জাকাতের নিয়ত করা যাবে না।

জাকাত শুধু হালাল সম্পদের ওপর আদায়যোগ্য। তাই ব্যাংকের সুদের অংশ আলাদা করে মূল টাকা থেকে পৃথক করে নেওয়া জরুরি।

জাকাত দেওয়ার সময় নিয়ত করা আবশ্যক। মনে মনে নিয়ত করতে হবে যে এটি ফরজ জাকাত আদায় করা হচ্ছে। মুখে বলা জরুরি নয়, তবে অন্তরে নিয়ত থাকা শর্ত।

জাকাত অবশ্যই শরিয়ত নির্ধারিত খাতে দিতে হবে, যেমন ফকির, মিসকিন, অভাবগ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত, মুসাফির বা যাদের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় না।

ব্যাংকে জমানো টাকার জাকাত বছরে একবার নির্দিষ্ট তারিখে হিসাব করা উত্তম। অনেকে রমজান মাসকে নির্দিষ্ট করে নেন, যাতে প্রতি বছর একই সময়ে জাকাত আদায় করা সহজ হয়।

একবার একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে নিলে পরবর্তী বছরগুলোতে সেই তারিখ অনুযায়ী হিসাব করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক পদ্ধতি।

আরও পড়ুনঃ ফিতরা কখন এবং কাকে দিতে হয়?

জাকাত দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র হয় এবং আল্লাহর বরকত বৃদ্ধি পায়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো, এর মাধ্যমে তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।” এই আয়াত প্রমাণ করে যে জাকাত শুধু দরিদ্রের অধিকার নয়, বরং ধনীর সম্পদকে শুদ্ধ করার মাধ্যম।

উপসংহার হিসেবে বলা যায়, ব্যাংকে জমা রাখা টাকা নিঃসন্দেহে জাকাতযোগ্য সম্পদ। নিসাব পূর্ণ হলে এবং এক বছর অতিক্রম করলে এর ২.৫ শতাংশ জাকাত আদায় করা ফরজ।

সঠিকভাবে হিসাব করা, সুদের টাকা আলাদা করা, বৈধ খাতে জাকাত প্রদান করা এবং সময়মতো আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। এর মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X