

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


জাকাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। এর মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রয়োজন পূরণ হয় এবং ধনীদের সম্পদ পবিত্র হয়।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—নিজের আপন ভাই বা বোন যদি দরিদ্র হয়, তাহলে তাকে কি জাকাত দেওয়া যাবে? ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
ইসলামে জাকাত দেওয়া যাবে এমন ব্যক্তিদের তালিকা কুরআনে নির্ধারিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“জাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়ে নিযুক্ত কর্মচারী, যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত।” (সূরা তাওবা: ৬০)।
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় মিথ্যা কথা বা গীবত করলে কি রোজা কবুল হয়?
এই আয়াতে ভাই বা বোনকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং শর্ত হলো, তারা যেন জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত দরিদ্র বা মিসকিন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়।
শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো—যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনার ওপর ফরজ, তাদেরকে জাকাত দেওয়া যাবে না।
যেমন বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, সন্তান ও নাতি-নাতনিকে জাকাত দেওয়া জায়েজ নয়। কারণ তাদের খরচ বহন করা সন্তানের ওপর আবশ্যক।
কিন্তু ভাই ও বোনের ভরণপোষণ শরিয়ত অনুযায়ী সাধারণভাবে ফরজ নয়, যদি না তারা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে আপনার ওপর নির্ভরশীল হয়।
তাই ভাই বা বোন যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয় এবং দরিদ্র অবস্থায় থাকে, তবে তাকে জাকাত দেওয়া বৈধ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়দের জাকাত দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
আরও পড়ুনঃ বদনজর বা অশ্লীল ভিডিও দেখলে কি রোজা ভেঙে যায়?
“গরিবকে সদকা দিলে একটি সওয়াব, আর আত্মীয়কে সদকা দিলে দুটি সওয়াব—একটি সদকার সওয়াব এবং আরেকটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব।” (তিরমিজি, নাসাঈ)।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ভাই বা বোনকে জাকাত দিলে শুধু ফরজ আদায়ই হয় না, বরং আত্মীয়তার সম্পর্কও মজবুত হয়।
তবে কিছু শর্ত অবশ্যই মানতে হবে। ভাই বা বোন যদি আপনার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং আপনি নিয়মিত তাদের খরচ বহন করেন, তাহলে সেই অবস্থায় জাকাত দেওয়া যাবে না, কারণ এটি আপনার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
আবার যদি ভাই বা বোন ধনী হয়, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, অথবা কর্মক্ষম হয় কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ না করে, তাহলে তাকেও জাকাত দেওয়া যাবে না। জাকাত দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়ত। ভাই বা বোনকে সাহায্য করার সময় অবশ্যই মনে মনে জাকাতের নিয়ত থাকতে হবে। শুধু উপহার বা সহানুভূতির দান হিসেবে দিলে তা জাকাত হিসেবে গণ্য হবে না।
জাকাত দেওয়ার সময় বলা জরুরি নয় যে এটি জাকাত, তবে অন্তরে নিয়ত থাকা আবশ্যক। প্রয়োজনে সম্মানের সাথে গোপনে দেওয়া উত্তম, যাতে আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভাই বা বোন ঋণগ্রস্ত থাকে, চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ চালাতে পারে না। তারা যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়, তবে তাদের জাকাত দেওয়া উত্তম কাজ।
আরও পড়ুনঃ জাকাত কাদের ওপর ফরজ এবং হিসাব করার সহজ নিয়ম।
এতে একদিকে ফরজ আদায় হবে, অন্যদিকে পরিবারে ভালোবাসা ও সহযোগিতার বন্ধন দৃঢ় হবে। ইসলামে আত্মীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়াকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার হিসেবে বলা যায়, নিজের আপন ভাই-বোন যদি দরিদ্র হয় এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়, তবে তাদের জাকাত দেওয়া জায়েজ এবং উত্তম। এতে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়—একটি জাকাত আদায়ের এবং আরেকটি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার।
তবে যাদের ভরণপোষণ আপনার ওপর ফরজ, যেমন বাবা-মা ও সন্তান, তাদের জাকাত দেওয়া যাবে না।
তাই জাকাত দেওয়ার আগে ভাই বা বোনের আর্থিক অবস্থা যাচাই করা, সঠিক নিয়ত করা এবং শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে সম্মানের সাথে সাহায্য করা সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি।
মন্তব্য করুন

