

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা ও তারাবির নামাজ—দুটি ইবাদতই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মুসলমানের মনে প্রশ্ন জাগে, যদি কেউ তারাবির নামাজ না পড়ে, তাহলে কি তার রোজা সহিহ হবে না বা রোজা বাতিল হয়ে যাবে?
ইসলামের শরিয়তের আলোকে এই প্রশ্নের পরিষ্কার ও সঠিক উত্তর জানা জরুরি, যাতে অযথা সন্দেহ ও ভুল ধারণা থেকে মুক্ত থাকা যায়।
প্রথমত, রোজা এবং তারাবির নামাজের হুকুম এক নয়। রোজা হলো ফরজ ইবাদত, যা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সক্ষম মুসলমানের ওপর আবশ্যক।
আরও পড়ুনঃ রোজার নিয়ত আরবিতে না করলে কি রোজা হবে?
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)।
তারাবির নামাজ হলো সুন্নতে মুআক্কাদা, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত আদায় করেছেন এবং সাহাবাদের তা আদায়ের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। কিন্তু এটি ফরজ নয়।
দ্বিতীয়ত, তারাবির নামাজ না পড়লে রোজা বাতিল হয় না। কারণ রোজার সহিহ হওয়ার শর্ত হলো নিয়ত করা এবং সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা।
তারাবির নামাজ রোজার শর্তের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং কেউ যদি রোজা রাখে কিন্তু কোনো কারণে তারাবির নামাজ আদায় না করে, তাহলে তার রোজা শরিয়ত অনুযায়ী সহিহ হবে।
তৃতীয়ত, তারাবির নামাজের ফজিলত অত্যন্ত বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে নামাজ আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, তারাবির নামাজ রোজার পূর্ণতা ও আত্মশুদ্ধির একটি বড় মাধ্যম। যদিও এটি ফরজ নয়, কিন্তু এর সওয়াব ও গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
আরও পড়ুনঃ ইফতারের সহীহ দোয়া ও বাংলা অর্থ।
চতুর্থত, তারাবির নামাজ না পড়া গুনাহ কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মত হলো, যেহেতু এটি সুন্নতে মুআক্কাদা, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়মিতভাবে তা পরিত্যাগ করা গুনাহের কাছাকাছি কাজ।
তবে এতে রোজা নষ্ট হয় না। যেমন কেউ যদি ফজরের পর সুন্নত নামাজ না পড়ে, তার ফরজ নামাজ সহিহ হয়, কিন্তু সে একটি বড় সুন্নত আমল থেকে বঞ্চিত হয়।
একইভাবে, তারাবি না পড়লে রোজা থাকবে, কিন্তু রমজানের বিশেষ বরকত ও ফজিলত থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করবে।
পঞ্চমত, বাস্তব জীবনে অনেক মানুষের জন্য তারাবির নামাজ না পড়ার কারণ হতে পারে অসুস্থতা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, কাজের চাপ বা অন্য বৈধ ওজর। ইসলামে এমন মানুষের ওপর কঠোরতা নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)।
তাই কেউ যদি প্রকৃত ওজরের কারণে তারাবি আদায় করতে না পারে, তাহলে তার কোনো গুনাহ হবে না এবং তার রোজাও পূর্ণভাবে সহিহ থাকবে।
ষষ্ঠত, তারাবির নামাজ রোজার আত্মিক সৌন্দর্য বাড়ায়। রোজা শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়, বরং আত্মসংযম, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও রাতের নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সময়।
আরও পড়ুনঃ তারাবির নামাজ ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত? সঠিক সমাধান।
তারাবির মাধ্যমে মানুষ কুরআন শোনে, মন নরম হয় এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকার শক্তি পায়। তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে তারাবিকে অবহেলা না করে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তারাবির নামাজ না পড়লেও রোজা বাতিল হয় না এবং রোজা সহিহ থাকে। কারণ রোজা ফরজ ইবাদত এবং তারাবি সুন্নাহ ইবাদত।
তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ও অলসতার কারণে তারাবি পরিত্যাগ করা একজন মুসলমানের জন্য ক্ষতির কারণ, কারণ সে রমজানের বিশেষ ফজিলত ও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সাধ্য অনুযায়ী তারাবির নামাজ আদায় করা এবং রোজার সঙ্গে সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ইবাদতকেও গুরুত্ব দেওয়া, যাতে রমজানের পূর্ণ বরকত ও রহমত লাভ করা যায়।
মন্তব্য করুন

