শুক্রবার
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক জনসভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম
নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা
expand
নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা
  • আইনের তোয়াক্কা না করে নির্বাচনী জনসভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা
  • আছেন বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন জিয়া পরিষদের পদেও
  • আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ
  • নিয়ম অনুযায়ী বিধিসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে- বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র

কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকে রাজনীতি নিষিদ্ধ। এই সংস্থার কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরাও রাজনীতি করতে পারবেন না আইন অনুযায়ী। এমনকি থাকতে পারবেন না কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা অঙ্গসংগঠনের পদেও। কিন্তু এসব আইনের তোয়াক্কা না করে এবারের নির্বাচনী জনসভা ও কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কতিপয় কর্মকর্তা। এমন অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এমন ঘটনা বিগত স্বৈরাচার হাসিনার সময়েও আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তারা এ সাহস করেননি। তবে ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরে এমন ঘটনাই ঘটালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএনপিপন্থী কিছু কর্মকর্তা।

বুধবার ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পেশাজীবী পরিষদের ব্যানারে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনী সমাবেশ ও শোভাযাত্রা করা হয়। সে ব্যানারে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভোট দিয়ে জয়ী করার জন্য প্রচারণা চালান ব্যাংকার কর্মকর্তারা। আছেন বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন জিয়া পরিষদের পদেও।

জিয়া পরিষদের প্যাডে চলতি বছরের জানুয়ারির ২২ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ ও ঢাকা-৯ আসনের নির্বাচন পরিচালনা ও কেন্দ্রীয় উপকমিটির পদে আছেন মাহবুবুর রহমান। তিনি জিয়া পরিষদ বাংলাদেশ ব্যাংক শাখার সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০৯ ব্যাচের নিয়োগপ্রাপ্ত ও বর্তমানে অতিরিক্ত পরিচালক পদে কর্মরত আছেন প্রধান শাখায়।

এছাড়া একই মিছিলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালাইটিক্স ডিপার্টমেন্টের অতিরিক্ত পরিচালক মাহবুবুর রহমান। আরও উপস্থিত ছিলেন ইএমডি-১ ডিপার্টমেন্টের যুগ্ম পরিচালক হানিফুল ইসলামসহ কমপক্ষে ১০ জন কর্মকর্তা। মিছিলে তারা ধানের শীষ সম্বলিত টি-শার্ট ও ক্যাপ পরিহিত হয়ে মিছিল করে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান। এ বিষয়টিকে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত ও সাবেক কর্মকর্তারা।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গিয়েছিলেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তখন তার আশেপাশে দেখা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের। সেখানে ছিলেন গভর্নর অফিসের নির্বাহী পরিচালক মো. সারোয়ার হোসাইন। তিনি মির্জা আব্বাসকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান গেট থেকে ভেতরে নিয়ে যান। সেখানেও ছিলেন ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের অতিরিক্ত পরিচালক আলী হোসেন। আইবিআরপিডির অতিরিক্ত পরিচালক জাকির হোসেনসহ আরও প্রায় ৭-৮ জন কর্মকর্তা প্রোটোকল দিয়ে ভেতরে নিয়ে যান মির্জা আব্বাসকে।

এসব আচরণ ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকে কখনো হয়নি জানিয়ে একজন কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে অনেক বড় বড় এমপি এবং মন্ত্রীরাও বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছেন। কিন্তু কখনো কাউকে ব্যাংকের গেট থেকে প্রোটোকল দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়নি। বিএনপি এখনো ক্ষমতায় আসেনি, নির্বাচনের আগেই ব্যাংকের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা যেভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম করছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর এবং আশ্চর্যের। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়েও এমন সাহস করতে পারেনি আওয়ামী সমর্থিত কর্মকর্তারা।’

বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস অ্যাক্ট-২০০৩ অনুযায়ী কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার জাতীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে রেগুলেশন ১৮। এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা কার্যক্রমে অংশ নিতে, সাহায্য করতে বা কোনোভাবে সহায়তা করতে পারবেন না। বিশেষ করে জাতীয় বা অন্য কোনো নির্বাচনে প্রচারণা ও প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন না। বাংলাদেশে বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে না। এছাড়া গোপন ভোটদান করতে পারবেন, কিন্তু কাকে ভোট দেবেন বা দিয়েছেন তা কোনোভাবেই প্রকাশ করতে পারবেন না।’

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় মিছিলে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক আলী হোসেন এবং মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত থাকা অবস্থায় তারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেন কি না জানতে চাইলে আলী হোসেন এনপিবি নিউজকে এড়িয়ে যান। তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন বলে পরবর্তীতে ফোন করবেন বলেই ফোন কেটে দেন। মাহবুবুর রহমান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমরা গিয়েছিলাম ফরহাদ আলম ডোনার ভাইয়ের আমন্ত্রণে। জিয়া পরিষদের ব্যানারে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেইনি। বাংলাদেশ ব্যাংকেও জিয়া পরিষদের শাখা আছে।’

এটি রাজনৈতিক সংগঠনের অঙ্গসংগঠন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে এটি কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয়। তাই আমরা পেশাজীবী হিসেবে এই মিছিলে অংশগ্রহণ করি। এখানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, ব্যাংকার—সব ধরনের পেশাজীবী ছিল।’ বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী ভোট চাওয়া যাবে না। তবুও তারা কেন ভোট চাইলেন এবং এটি আইনের লঙ্ঘন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে জানি না।’

মিছিলে অংশগ্রহণ করা একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কমন সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট-১-এর অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক শিপলু স্যার। তিনি বলেন, এমনি একটা প্রোগ্রাম আছে, সেখানে উপস্থিত হতে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের সমাবেশ তা জানা ছিল না। আমন্ত্রণ করে তিনি নিজেই সে মিছিলে আসেননি।’

রেগুলেশন ৪১ অনুযায়ী যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেন তবে তাকে অসদাচরণ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। এছাড়া রেগুলেশন ৪৪ দ্বারা অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অপসারণ অথবা চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং তিরস্কার করা হবে বলে বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাজনৈতিক কোনো সভা-সমাবেশে অংশ নিতে পারেন না। এরপরও যদি কেউ নিয়ে থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী বিধিসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এমন কোনো বিষয় আমাদের চোখে পড়েনি। আমাদের নজরে এলে আমরা এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X