

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


তারাবির নামাজ রমজান মাসের একটি বিশেষ সুন্নাহ ইবাদত, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেছেন।
মুসলমানদের মধ্যে একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো—তারাবির নামাজ কি ৮ রাকাত, না কি ২০ রাকাত?
এই বিষয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও কুরআন, হাদিস ও সাহাবাদের আমল পর্যালোচনা করলে একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান পাওয়া যায়।
প্রথমত, ৮ রাকাতের প্রমাণ হাদিস থেকে পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান ও অন্যান্য সময়ে ১১ রাকাতের বেশি নামাজ আদায় করতেন না।”
আরও পড়ুনঃ পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর গোসল না করে রোজা রাখা যাবে কি?
এই ১১ রাকাতের মধ্যে ৮ রাকাত কিয়ামুল লাইল বা তারাবি এবং ৩ রাকাত বিতর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই হাদিস সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদিসের ভিত্তিতে অনেক আলেম বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মূলত ৮ রাকাত তারাবি পড়েছেন এবং সেটিই সুন্নাহর সবচেয়ে কাছাকাছি পদ্ধতি।
দ্বিতীয়ত, ২০ রাকাতের প্রমাণ সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে পাওয়া যায়। হযরত উমর (রা.) তাঁর খিলাফতকালে মুসলমানদের এক ইমামের পেছনে জামাতে তারাবি পড়ার ব্যবস্থা করেন এবং তখন ২০ রাকাত তারাবি পড়া হতো।
এই বিষয়টি ইমাম মালিক, ইমাম বায়হাকি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের এই ঐক্যমতপূর্ণ আমলকে ইসলামী ফিকহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গণ্য করা হয়।
তৃতীয়ত, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত জামাতে ২০ রাকাত পড়াননি, কারণ তিনি ভয় করেছিলেন যে এটি ফরজ হয়ে যেতে পারে। তাই তিনি কয়েক রাত জামাতে নামাজ পড়িয়ে পরে নিজ ঘরে পড়া শুরু করেন।
আরও পড়ুনঃ রোজার নিয়ত আরবিতে না করলে কি রোজা হবে?
এতে বোঝা যায়, রাকাতের সংখ্যা নির্ধারণের চেয়ে মূল উদ্দেশ্য ছিল কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজকে সহজ ও নিয়মিত করা।
চতুর্থত, ইসলামী ফিকহের চারটি মাজহাবের মধ্যে হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাব ২০ রাকাত তারাবিকে সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
মালেকি মাজহাবে কোথাও ২০ রাকাত, কোথাও আরও বেশি পড়ার রেওয়াজ দেখা যায়। অর্থাৎ উম্মাহর বড় অংশ ২০ রাকাতকে গ্রহণযোগ্য আমল হিসেবে মেনে এসেছে শত শত বছর ধরে।
পঞ্চমত, মূল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রশ্ন—কোনটি বেশি সহিহ? প্রকৃতপক্ষে, ৮ রাকাত এবং ২০ রাকাত—উভয়েরই সহিহ ভিত্তি রয়েছে।
৮ রাকাতের ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত আমল এবং ২০ রাকাতের ভিত্তি হলো সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ইসলামে সাহাবাদের সম্মিলিত আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরও পড়ুনঃ ইফতারের সহীহ দোয়া ও বাংলা অর্থ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারাবির নামাজের মূল উদ্দেশ্য রাকাতের সংখ্যা নয়, বরং দীর্ঘ কিরাত, ধৈর্য, খুশু ও খুজু সহকারে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।
কেউ যদি ৮ রাকাত পড়ে বেশি মনোযোগ ও তিলাওয়াতসহ নামাজ আদায় করে, সেটিও উত্তম। আবার কেউ যদি ২০ রাকাত পড়ে নিয়মিত ও ধীরস্থিরভাবে আদায় করে, সেটিও সুন্নাহর পরিপন্থী নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে নামাজ আদায় করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” এই হাদিসে রাকাতের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি, বরং নিয়ত ও আমলের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার হিসেবে বলা যায়, তারাবির নামাজ ৮ রাকাতও সহিহ, আবার ২০ রাকাতও সহিহ। ৮ রাকাত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত আমল দ্বারা প্রমাণিত এবং ২০ রাকাত সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রমাণিত।
তাই একটিকে ভুল ও অন্যটিকে একমাত্র সঠিক বলা ঠিক নয়। বরং যেটি স্থানীয় মসজিদের নিয়ম, সেটির সঙ্গে জামাতে অংশগ্রহণ করাই উত্তম।
মুসলমানদের উচিত এই বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ না করে ঐক্য বজায় রাখা এবং তারাবির মূল উদ্দেশ্য—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন—এর দিকে মনোযোগ দেওয়া।
মন্তব্য করুন

