

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কুরআন তিলাওয়াত শুধু পাঠ করার ইবাদতই নয়, বরং এটি বান্দা ও আল্লাহ তাআলার মধ্যে গভীর আত্মিক সংযোগের মাধ্যম। কুরআনের কিছু নির্দিষ্ট আয়াত রয়েছে, যেগুলো তিলাওয়াত বা শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে সিজদা করার নির্দেশ বহন করে। এই সিজদাকে বলা হয় সিজদায়ে তিলাওয়াত।
সিজদায়ে তিলাওয়াত আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত বিনয়, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য প্রকাশ। কুরআনের আয়াত পাঠ করে যখন বান্দা সরাসরি সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, তখন তার অন্তর আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে যায়।
কুরআনে মোট চৌদ্দটি স্থানে সিজদার আয়াত রয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টি, ফেরেশতা ও মুমিনদের সিজদার কথা উল্লেখ করেছেন। এসব আয়াত তিলাওয়াত করলে বা কেউ তিলাওয়াত করতে শুনলে সিজদায়ে তিলাওয়াত করা সুন্নতে মুআক্কাদা বা ওয়াজিব—
এই বিষয়ে মাজহাবভেদে কিছু মতভেদ থাকলেও সবাই একমত যে এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। হানাফি মাজহাবে সিজদার আয়াত পড়লে বা শুনলে সিজদা করা ওয়াজিব, আর অন্যান্য মাজহাবে এটি সুন্নত।
আরও পড়ুনঃ রমজান মাসে রিজিক ও বরকত বৃদ্ধির কার্যকরী দোয়া ও আমল।
সিজদায়ে তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নত করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তাদের কাছে যখন রহমানের আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।” এই আয়াত প্রমাণ করে, সিজদা শুধু শারীরিক ভঙ্গি নয়; বরং এটি অন্তরের গভীর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।
সিজদায়ে তিলাওয়াতে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ দোয়া নেই, অর্থাৎ এমন কোনো দোয়া নেই যা না পড়লে সিজদা শুদ্ধ হবে না। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিছু দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যা সিজদায়ে তিলাওয়াতের সময় পড়া মুস্তাহাব।
সহিহ হাদিসে এসেছে, নবীজি সিজদায়ে তিলাওয়াতের সময় বলতেন, “সাজাদা ওয়াজহিয়া লিল্লাজি খালাকাহু ওয়া শাক্কা সাম’আহু ওয়া বাসারাহু বিহাওলিহি ওয়া কুওয়াতিহি, ফাতাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিকিন।”
এই দোয়াটির অর্থ হলো, আমি আমার চেহারা সেই সত্তার সামনে সিজদাবনত করলাম, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং নিজ কুদরত ও শক্তিতে আমাকে কান ও চোখ দান করেছেন। এই দোয়ার মাধ্যমে বান্দা নিজের অস্তিত্ব ও সব নিয়ামতের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
আরও পড়ুনঃ ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইফতারের আগে যে দোয়া পড়বেন।
এছাড়াও সাধারণ নামাজের সিজদায় যে দোয়া পড়া হয়, সেটিও সিজদায়ে তিলাওয়াতে পড়া জায়েজ। যেমন “সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা” বলা উত্তম। কারণ সিজদা মানেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও পবিত্রতা ঘোষণা করা। আলেমগণ বলেন, যদি কেউ নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ না জানে, তাহলে অন্তত এই তাসবিহ পড়লেই সিজদায়ে তিলাওয়াত আদায় হয়ে যায়।
সিজদায়ে তিলাওয়াতের সময় নিজের ভাষায় দোয়া করাও বৈধ। কারণ এটি নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এই সিজদায় বান্দা আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ, হিদায়াত, ইমানের দৃঢ়তা এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ চাইতে পারে। অনেক আলেম বলেন, কুরআনের সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করার পর সিজদায় পড়ে অন্তর থেকে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ আশা করা যায়।
সিজদায়ে তিলাওয়াত নামাজের ভেতর ও নামাজের বাইরে—উভয় অবস্থায়ই করা যায়। নামাজের বাইরে করলে অজু থাকা শর্ত কি না—এ নিয়ে মাজহাবভেদে মতপার্থক্য আছে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, অজু থাকা উত্তম ও নিরাপদ। কিবলামুখী হওয়া এবং আল্লাহর সামনে বিনয়ী হওয়া সিজদার আদবের অংশ।
আরও পড়ুনঃ কুরআন খতম দেওয়ার পর যে দোয়া পড়তে হয় (খতমে কুরআনের দোয়া)।
আত্মিক দিক থেকে সিজদায়ে তিলাওয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি বান্দার অহংকার ভেঙে দেয় এবং আল্লাহর সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা স্মরণ করিয়ে দেয়। কুরআনের আয়াত পাঠ করে সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় পড়া প্রমাণ করে যে, কুরআনের নির্দেশ বান্দার জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলছে।
সবশেষে বলা যায়, সিজদায়ে তিলাওয়াত কুরআনের প্রতি একজন মুমিনের গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। এই সিজদায় নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক দোয়া না থাকলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো দোয়া পড়া সর্বোত্তম।
আর দোয়ার শব্দের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনয়ী হৃদয় ও আল্লাহর সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। যে ব্যক্তি এই চেতনা নিয়ে সিজদায়ে তিলাওয়াত আদায় করে, আল্লাহ তাআলা তার ইমান ও আমলে বিশেষ বরকত দান করেন।
মন্তব্য করুন

