

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কুরআন মাজিদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও হিদায়াতের গ্রন্থ। কুরআন তিলাওয়াত করা যেমন ইবাদত, তেমনি পুরো কুরআন শেষ করা বা খতম দেওয়া একটি বড় নেক আমল। বিশেষ করে রমজান মাসে কুরআন খতম দেওয়ার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, কারণ এই মাসেই কুরআন নাজিল হয়েছে।
কুরআন খতমের পর দোয়া করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমল, যা সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের আমল দ্বারা প্রমাণিত।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়।” আলেমগণ বলেন, কুরআন তিলাওয়াত শেষ করার পর দোয়া করা এই রহমত লাভের একটি বিশেষ মুহূর্ত।
কারণ কুরআন পাঠের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকে এবং খতমের সময় সে সংযোগের পরিপূর্ণতা অর্জন করে।
আরও পড়ুনঃ কঠিন বিপদ ও রোগবালাই থেকে মুক্তির জন্য রোজার মাসের দোয়া।
হাদিস ও সাহাবিদের আমল থেকে জানা যায়, কুরআন খতমের পর দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ আশা করা যায়। হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি যখন কুরআন খতম করতেন, তখন নিজের পরিবার-পরিজনদের একত্র করতেন এবং সম্মিলিতভাবে দোয়া করতেন।
ইমাম দারেমি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। আলেমগণ এই আমল থেকে প্রমাণ গ্রহণ করেছেন যে, খতমে কুরআনের দোয়া করা মুস্তাহাব এবং বরকতময়।
খতমে কুরআনের দোয়ার নির্দিষ্ট কোনো ফরজ বা ওয়াজিব শব্দমালা নেই। অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হুবহু নির্দিষ্ট একটি দোয়া সহিহ সনদে বর্ণিত হয়নি।
তবে সাহাবি ও তাবেয়িদের আমলের আলোকে আলেমগণ এমন দোয়া পড়াকে উত্তম বলেছেন, যাতে আল্লাহর প্রশংসা, দরুদ, কুরআনের মাধ্যমে হিদায়াত লাভের শুকরিয়া এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা হয়। বর্তমানে যে খতমে কুরআনের দোয়াগুলো প্রচলিত রয়েছে, সেগুলো মূলত কুরআন ও সহিহ হাদিসের বিভিন্ন দোয়ার সংকলন।
আরও পড়ুনঃ রমজান মাসে রিজিক ও বরকত বৃদ্ধির কার্যকরী দোয়া ও আমল।
খতমে কুরআনের দোয়ায় সাধারণত এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে—আল্লাহর কাছে কুরআন তিলাওয়াত কবুল হওয়ার আবেদন, কুরআনকে অন্তরের নূর ও পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক চাওয়া, কুরআনের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার শক্তি কামনা করা
এবং কুরআনের মাধ্যমে গুনাহ মাফ ও জান্নাত লাভের দোয়া করা। এসব দোয়ার ভিত্তি কুরআনের আয়াত ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ দোয়াগুলোতেই নিহিত।
রমজান মাসে খতমে কুরআনের দোয়ার গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এই মাসে নেক আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানে জিবরাইল আলাইহিস সালামের সঙ্গে কুরআন দাওর করতেন,
যা কুরআন খতম ও পুনরাবৃত্তির বিশেষ মর্যাদা প্রমাণ করে। আলেমগণ বলেন, রমজানে কুরআন খতমের পর দোয়া করলে তা রহমত ও মাগফিরাত লাভের একটি বড় মাধ্যম হয়।
খতমে কুরআনের দোয়া একা পড়লেও তা কবুলের আশা করা যায়, আবার পরিবার বা মুসল্লিদের নিয়ে সম্মিলিতভাবেও পড়া জায়েজ। তবে দোয়ার সময় অন্তরের উপস্থিতি ও আন্তরিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু মুখে শব্দ উচ্চারণ করলেই যথেষ্ট নয়; বরং কুরআনের হক আদায়ের প্রতিজ্ঞা, আল্লাহর সামনে নিজের দুর্বলতা স্বীকার এবং হিদায়াতের ওপর অটল থাকার দোয়া থাকা জরুরি।
আরও পড়ুনঃ ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ইফতারের আগে যে দোয়া পড়বেন।
আলেমগণ আরও বলেন, কুরআন খতমের পর দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা। কুরআন পড়ে যদি আমলে পরিবর্তন না আসে, তবে খতমের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, এই কুরআন মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত। তাই খতমে কুরআনের দোয়ায় এই রহমত যেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, সেই আবেদন করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, খতমে কুরআনের দোয়া কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কুরআন খতমের পর দোয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে নিজের ইমান, আমল, পরিবার ও পুরো উম্মাহর জন্য কল্যাণ কামনা করে।
যারা আন্তরিকতার সঙ্গে এই দোয়া করে এবং কুরআনের পথে চলার চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের জীবনে কুরআনের নূর ও বরকত দান করেন—ইনশাআল্লাহ।
মন্তব্য করুন

