মঙ্গলবার
৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিম্বারের মানুষটিরও একটি সংসার আছে

জাহিদ ইকবাল
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

একটি সমাজ কতটা সভ্য ও মানবিক, তা পরিমাপের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—সেই সমাজ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রদ্ধেয় মানুষদের কেমন মর্যাদা দিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা। যারা সমাজকে নৈতিকতার আলো দেখান, মানুষকে সৎ ও সুন্দর জীবনযাপনের অনুপ্রেরণা দেন এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহর পথে চলার দিকনির্দেশনা দেন, তাঁদের প্রতি সমাজের আচরণই আসলে সেই সমাজের সামগ্রিক বিবেকের আয়না। আমাদের বাংলাদেশে মসজিদের ইমাম ও খতিবরা ঠিক এমনই এক শ্রেণির মানুষ, যাঁদের আমরা মুখে ‘মাথার তাজ’ বলে অত্যন্ত সম্মান করি, কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁদের মৌলিক ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিই।

​প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমরা যাঁর পেছনে পরম শ্রদ্ধায় দাঁড়াই, যাঁর কণ্ঠে কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াত শুনে আমাদের অশান্ত মন প্রশান্ত হয়, যিনি আমাদের সন্তানদের শৈশবে পরম মমতায় কুরআন শিক্ষা দেন, জীবনের শেষ বিদায়ে জানাজার নামাজ পড়ান, আনন্দ-উৎসবে বিবাহ পড়ান, এমনকি পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ মীমাংসায় ইসলামের আলোতে সুপরামর্শ দেন—সেই মানুষটির মাস শেষে নিজের ছোট্ট সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখতে হয়। এটি শুধু একজন ইমামের ব্যক্তিগত জীবনের করুণ আখ্যান নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চেতনারও এক নির্মম, রূঢ় প্রতিচ্ছবি।

​আজ রাজধানী ঢাকা শহরের আলিশান সব মসজিদের দিকে তাকালেই এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। অধিকাংশ মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা এমন এক নামমাত্র সম্মানী বা বেতন পান, যা বর্তমান আকাশচুম্বী বাজারদর, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরিসংখ্যান বা বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে একটি অভিজাত পরিবারের গাড়িচালক, বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মী কিংবা কোনো অফিসের পিয়নের মাসিক আয়ও একজন উচ্চশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ইমামের চেয়ে অনেক বেশি। ​ এখানে কোনো পেশার মর্যাদাকে ছোট করা হচ্ছে না। ইসলাম ও মানবতা—উভয় দৃষ্টিতেই প্রতিটি হালাল পেশাই পরম সম্মানের। কিন্তু প্রশ্নটা নীতি ও যোগ্যতার। যে ব্যক্তি সমাজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি জীবনের সেরা সময়গুলো ব্যয় করে কামিল, দাওরায়ে হাদিস কিংবা উচ্চতর ইসলামী শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যাঁর কাঁধে একটি গোটা সমাজের ঈমানি পরিবেশ রক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিনির্মাণের গুরুদায়িত্ব, তাঁর পুরো জীবন কেন চিরকাল অনিশ্চয়তা, দৈন্য আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে কাটবে?

​আমরা ওয়াজ মাহফিলে, জুমার খুতবার আগে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে মাইক পেলেই অবলীলায় বলি, ইমাম সাহেবরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি।" কিন্তু সেই সম্মান যদি শুধু মুখের কথায়, মঞ্চের ফুল আর লোকদেখানো করমর্দনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই সম্মানের কি কোনো বাস্তব মূল্য আছে? প্রকৃত সম্মান তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন একজন মানুষের শ্রম, জ্ঞান, যোগ্যতা ও সামাজিক অবদানের একটি সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য বস্তুগত মূল্য নিশ্চিত করা যায়। ​ আজকের অর্থনৈতিক সংকটের বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ছোট পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয় কত—তা নতুন করে হিসাব করে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাসাভাড়া, চাল-ডাল-তেল-নুন, মাছ-মাংস, চিকিৎসা খরচ, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, সন্তানের স্কুলের বেতন ও যাতায়াত—সবকিছুর খরচ গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বাজারে গেলে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষকে নতুন ও বর্ধিত দামের ধাক্কা সইতে হচ্ছে। কিন্তু কোটি টাকার প্রশ্ন হলো—এই ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের কয়টি মসজিদে ইমামদের বেতন বাড়ানো হয়েছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর আসবে অত্যন্ত হতাশাজনক—‘না’।

​বছরের পর বছর ধরে অনেক নামী-দামি মসজিদেও ইমামদের বেতন একটি নির্দিষ্ট অঙ্কেই আটকে থাকে। ফলে অনেক ইমাম বাধ্য হয়ে, কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও, নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে অতিরিক্ত টিউশনি করেন, কাকডাকা ভোরে বা তীব্র গরমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের কুরআন শিক্ষা দেন কিংবা অন্য কোনো ছোটখাটো উচ্ছিষ্ট আয়ের পথ খোঁজেন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাঁদের মূল দায়িত্বে। ​ একজন ইমামের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল তাঁর নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানচর্চা, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গবেষণা, পড়াশোনা এবং সমাজ সংস্কারের জন্য সময় দেওয়া। কিন্তু যখন সকাল-সন্ধ্যা নিজের সন্তানের দুধের টাকা, স্ত্রীর প্রেসক্রিপশনের ওষুধ আর আগামী মাসের বাসাভাড়ার দুশ্চিন্তা মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে, তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে কিতাব অধ্যয়ন বা ইসলামী গবেষণার পরিবেশ আর অবশিষ্ট থাকে না। সমাজ তখন এক প্রকার মেধাহীন ও চিন্তাশূন্য আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতির জন্যই ক্ষতিকর।

​ঢাকা শহরের অবস্থাই যেখানে এমন শোচনীয়, সেখানে মফস্বল, জেলা শহর কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের পরিস্থিতি আসলেই কল্পনাতীত এবং ভয়াবহ। ঢাকার বাইরে এই সংকটটি শুধু কম বেতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক শোষণে। গ্রামের বা মফস্বলের অধিকাংশ মসজিদে ইমামদের কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামোই নেই। সেখানে যা দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় ‘সম্মানী’ বা ‘ভাতা’। দেশের অনেক এলাকায় আজও একজন ফুল-টাইম ইমামের মাসিক সম্মানী মাত্র ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা, যা দিয়ে বর্তমান বাজারে এক সপ্তাহের সংসার চলাই অসম্ভব। ​ ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় এখনো ইমামদের জীবন চালাতে হয় ‘লিল্লাহ’ কিংবা ‘জায়গির’ প্রথার ওপর নির্ভর করে। একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ আলেমকে প্রতিদিন তিন বেলা তিন বাড়িতে গিয়ে খেতে হয়। এর চেয়ে বড় সামাজিক মানসিক দৈন্য আর কী হতে পারে? অনেক সময় দেখা যায়, কোরবানির চামড়ার টাকা কিংবা ধান কাটার মৌসুমে কৃষকদের দেওয়া সামান্য ধান-চালই হয় তাঁদের বছরের অন্যতম প্রধান সঞ্চয়। তাছাড়া গ্রামের মসজিদ কমিটিগুলো সাধারণত এলাকার প্রভাবশালী বা মাতব্বরদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যেখানে ইমামদের কোনো চাকরির নিশ্চয়তা থাকে না। কমিটির কোনো নেতার সামান্যতম মনঃপূত না হলে পরদিনই চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়। ​ ইসলাম কখনোই মানুষের ন্যায্য অধিকারকে অবহেলা বা খাটো করার শিক্ষা দেয় না। বরং শ্রম ও মেধার মূল্যায়নে ইসলাম সবচেয়ে প্রগতিশীল ও কঠোর। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।" (সূরা আন-নাহল: ৯০)। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের এজলাসে নয়, কর্মক্ষেত্রে শ্রমের সঠিক মূল্য নির্ধারণেও প্রতিষ্ঠা করতে হয়। একজন মানুষের যোগ্যতা ও সময় অনুযায়ী তাঁর শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়াও আল্লাহর নির্দেশিত এই পরম ন্যায়বিচারের অংশ। ​ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর বিখ্যাত বিদায় হজের ভাষণের আগেও এবং বিভিন্ন হাদিসে বারবার সতর্ক করে বলেছেন, "শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।" এই অমোঘ শিক্ষা শুধু সময়মতো টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার কথাই বলে না, বরং যুগের চাহিদা অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য ও মানসম্মত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার দিকেও সমাজের বিবেককে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাহলে আজ মুসলমানদের সমাজ হিসেবে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি আমাদের মসজিদের ইমামদের ক্ষেত্রে এই সুমহান শিক্ষার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছি?

​আমাদের সমাজের এক অদ্ভুত ও স্ববিরোধী মনস্তত্ত্ব দুঃখজনক হলেও সত্য। আমরা অনেক সময় মসজিদের বহুতল ভবন নির্মাণে, কোটি টাকার মার্বেল পাথর বসাতে, নামী ব্র্যান্ডের ঝাড়বাতি ঝোলাতে কিংবা তীব্র গরমে মুসল্লিদের আরামের জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে এক ডজন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বসাতে প্রতিযোগিতা করি। দাতা ও সাধারণ মুসল্লিরা এসব খাতে লাখ লাখ টাকা অনুদান দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। অবশ্যই আল্লাহর ঘর সুন্দর ও আরামদায়ক হওয়া উচিত। কিন্তু যে চমৎকার কাচঘেরা এসি মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব নামাজ পড়াচ্ছেন, সেই ঘরের পেছনে থাকা ইমামের নিজের কোয়ার্টারে যদি তাঁর সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি পড়ে থাকে, তবে মসজিদের সেই বাহ্যিক চাকচিক্য আর আভিজাত্য কি কোনো পূর্ণতা পায়? নাকি তা আমাদের চরম সামাজিক ভণ্ডামির এক বিশাল স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে?

​আমাদের মনে রাখা দরকার, একজন ইমামও রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, একজন বাবা। অন্য দশজন বাবার মতো তিনিও চান তাঁর সন্তানের মুখে সপ্তাহে অন্তত একদিন ভালো একটু মাছ-মাংস তুলে দিতে. একজন দায়িত্বশীল স্বামী হিসেবে তিনি চান অসুস্থ স্ত্রীর জন্য ভালো একজন চিকিৎসক দেখাতে। তিনি তো আকাশ থেকে নামা কোনো অলৌকিক ফেরেশতা নন; তিনি আমাদের মতোই সমাজের একজন অংশ। তাই কেবল ‘দুশ্চিন্তামুক্ত ও সম্মানজনক’ জীবনযাপনের অধিকার তাঁরও রয়েছে।

ইসলাম সরলতা ও অপচয়হীনতার শিক্ষা দেয়, বিলাসিতার নয়। কিন্তু ‘সরলতা’ আর ‘চরম অভাব’ বা ‘দারিদ্র্য’ এক জিনিস নয়। ইসলাম দারিদ্র্যকে কখনো আদর্শ বা ইবাদতের শর্ত বানায়নি।

​আমাদের সমাজ আরেকটি বড় ভুল করে। আমরা ইমামদের প্রতি উপচে পড়া আবেগ দেখাই, কিন্তু তাঁদের আইনি ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে টেবিল চাপড়ে কথা বলি না। ঈদের সময় একটা কমদামি পাঞ্জাবি বা গ্রামে একটা লুঙ্গি উপহার দিয়ে, কিংবা রমজান মাসে কিছু ইফতার সামগ্রী বা ফিতরার টাকা ইমামের হাতে তুলে দিয়ে আমরা মনে করি এক বিশাল দায়িত্ব পালন করে ফেলেছি! এই মানসিকতা এক ধরনের করুণার শামিল, যা একজন আত্মমর্যাদাশীল ইমামের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। প্রকৃত সম্মান কোনো করুণা বা দয়ার দান নয়; প্রকৃত সম্মান হলো এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল নিশ্চিত করা, যাতে করে কোনো ইমামকে কখনো কারও ব্যক্তিগত দয়ার পাত্র হতে না হয়।

​আমরা যদি যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মতো যোগ্য, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও দূরদর্শী মেধাবী তরুণদের ইমামতির মতো পবিত্র পেশায় আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হই, তবে পুরো সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক পতন অনিবার্য। আর তাঁদের আকৃষ্ট করতে হলে সবার আগে তাঁদের জন্য সম্মানজনক বেতন, আবাসন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা দিতেই হবে। দেশের সব মসজিদের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়, কিন্তু রাজধানী বা জেলা শহরের বড় বড় মসজিদ, ধনী বা অভিজাত মহল্লা, করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা এবং সামাজিক সদিচ্ছার সমন্বয় ঘটালে অনেক কিছুই সম্ভব।

​এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিটি অঞ্চলের বা ধনী মসজিদগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ এবং ধনকূবেরদের যাকাত-সদকার মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় ‘ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে, যা দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনুন্নত মসজিদের ইমামদের অতিরিক্ত ভাতা প্রদান করা সম্ভব। একই সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা দিয়ে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সর্বনিম্ন বেতন সীমা বাধ্যতামূলক করা উচিত, যার নিচে কোনো কমিটিকে লোক নিয়োগ করতে দেওয়া হবে না।

এছাড়াও ইমামদের কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁদের আধুনিক আইটি, আধুনিক কৃষি বা মৎস্য চাষের ওপর সরকারি প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাঁরা সসম্মানে বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন।

​মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলোরও অবিলম্বে আত্মসমালোচনা দরকার। দেশের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের ইনক্রিমেন্ট হয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মজুরি বাড়ে। তাহলে ইমামদের বেতন বছরের পর বছর কেন এক জায়গায় স্থবির থাকবে? অন্তত প্রতি বছর সরকারি মূল্যস্ফীতির সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বার্ষিক বেতন পর্যালোচনার একটি লিখিত বা আইনি নীতিমালা প্রতিটি মসজিদে থাকা উচিত। এটি কোনো দয়া নয়; এটি তাঁদের সবচেয়ে মৌলিক ও আইনি পাওনা।

​আজ আমাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেকের কাছে একটি প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি সত্যিই আমাদের ইমামদের মন থেকে সম্মান করি, নাকি স্রেফ লোকদেখানো বা কথার কথা হিসেবে সম্মানের বুলি আওড়াই? কারণ মুখের ফাঁকা বুলি আর বাস্তব সম্মানের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। বাস্তব সম্মান হলো সমাজের ইমামকে এমন এক নিশ্চিন্ত জীবন উপহার দেওয়া, যাতে তিনি তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ বা আগামীকালের বাজারের ব্যাগ নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন না হয়ে, সম্পূর্ণ ফ্রেশ মাইন্ডে কুরআন ও সুন্নাহর আসল আলো সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

​একটি জাতির পতন তখনই শুরু হয় এবং তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন সেই জাতি তার সবচেয়ে বড় আদর্শিক শিক্ষক ও ধর্মীয় পথপ্রদর্শককে চরম অবহেলা ও অর্থনৈতিক দীনতার মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেয়।

মসজিদ কেবল রুটিনমাফিক কপাল ঠেকানোর কোনো নিষ্প্রাণ স্থান নয়; এটি মানুষের চরিত্র ও সমাজ গঠনের এক জীবন্ত বিশ্ববিদ্যালয়। আর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা প্রাণ হলেন খোদ ইমাম। তাঁর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মানিত করা নয়; বরং একটি গোটা সমাজের আত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের দেয়ালকে ধসে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা।

​সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে সস্তা আবেগ ঝাড়ার বদলে নীতিনির্ধারণী টেবিলে শক্ত আলোচনায় নিয়ে আসার। সময় এসেছে সুউচ্চ মিনারের এসি মসজিদের বাহ্যিক জৌলুসের পাশাপাশি, মেহরাবে দাঁড়ানো মানুষটির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার। মুখের সস্তা সম্মানকে এবার রাষ্ট্রীয় ও কাঠামোগত বাস্তব সম্মানে রূপান্তর করা হোক। কারণ, বাজারদর প্রতিদিন বাড়ে; আর সেই বাজারে যদি ইমামদের বেতন একই তিমিরে আটকে থাকে, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, তা চরম সামাজিক ও মানবিক অবিচার।

​আমরা এমন এক মানবিক ও সাম্যবাদী বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে আমাদের সমাজের একজন ইমাম ফিন্যান্সিয়াল অনিশ্চয়তার সব ভয়ডর তুড়ি মেরে উড়িয়ে, বুক ফুলিয়ে, মাথা উঁচু করে তাঁর মহান দায়িত্ব পালন করবেন। কারণ আল্লাহর ঘরের অভিভাবকের সম্মান রক্ষা করা কেবল কোনো নির্দিষ্ট মসজিদ কমিটির দায় নয়, এটি গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়বদ্ধতা।

​লেখক পরিচিতি: জাহিদ ইকবাল একজন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র, জনস্বার্থ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গঠনমূলক সামাজিক ভাবনার সমন্বয়ে জনসচেতনতা তৈরিই তাঁর লেখার মূল লক্ষ্য।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Ivory Coast VS Norway
Scheduled
30 Jun, 11:00 PM
VS
World Cup